Header Ads

জাপান সফর – পর্ব ১

Vini vidi vici – এলাম, দেখলাম, বিজিত হলাম। হুমম, জানি, vici অর্থ ‘জয় করলাম’। কিন্তু আমার জাপান সফরের বিষয়টা দাঁড়িয়েছে ঠিক যেমন বললাম তেমন। বিকেলের আলোতে আকাশ থেকে প্রশান্ত মহাসাগরের নীল ঢেউয়ের মাঝে সবুজে ছাওয়া দ্বীপগুলো যে কি দুর্বারভাবে আমাকে আকর্ষন করছিলো! মাটিতে নামার সাথে সাথে দেশটি আমাকে মায়ার বাঁধনে বেঁধে ফেললো।
আমার মাথায় মাঝে মাঝে কিছু করার ঝোঁক চেপে বসে। গত এক বছর ধরে সেটা ছিলো জাপান সম্পর্কে পড়াশোনা করা, জাপানী ভাষা সম্পর্কে একটা ধারণা লাভ করা। জাপানে যাবার ঘুণাক্ষরেও কোন সম্ভাবনা ছিলোনা, কেবল নিজেকে চ্যালেঞ্জ দিতে ভালো লাগে সেজন্যই।
হঠাৎ অচিন্তনীয়ভাবে জীবনের মোড় ঘুরে গেল। তার সাথে পরিবর্তিত হোল কিছু সিদ্ধান্ত। ঠিক হোল এবার ক্যাল্গেরীর পালা শেষ, পরবর্তী গন্তব্য মালয়শিয়া। মালয়শিয়া যাবার সম্ভাব্য তিনটি ট্রানজিটের মধ্যে জাপানকেই আল্লাহ কবুল করলেন। আমার সুপ্ত ইচ্ছাগুলো আল্লাহ মাঝে মাঝে এমনভাবে বাস্তবে রূপায়িত করে দেন যে ভয় হয় সব জীবদ্দশায় পেয়ে গেলে পরে বুঝি আর কিছু বাকী না থাকে!
টোকিওর নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের সাথে সাথে দেখে অবাক হলাম এয়ারপোর্টের চতুষ্পার্শ্বে প্লেনের চেয়েও উঁচু উঁচু বাউন্ডারী দেয়া। বাউন্ডারীর বাইরে পাহাড়ের ওপর, বাউন্ডারী বেয়ে চারিদিকে সবুজের ছড়াছড়ি। পরবর্তীতে যে জায়গাগুলো ঘুরে দেখার সুযোগ হয়েছে সব জায়গায় দেখেছি আবাসিক এলাকার ভেতর দিয়ে অতিক্রান্ত প্রতিটি রাস্তার দু’পাশে এভাবে উঁচু করে বাউন্ডারী দেয়া কংক্রিট, লোহা কিংবা কাঁচ দিয়ে। জাপানের মাটির রঙ আমি বলতে পারবনা, কারণ রাস্তা কিংবা পার্কিং ব্যাতীত এমন এক ইঞ্চি জায়গা দেখিনি যা ঘাস, লতা, গুল্ম কিংবা বৃক্ষে আবৃত নয়, হোক সেটা শহরের মধ্যস্থলে কিংবা রাস্তার পাশে। ভ্যাঙ্কুভার ভিক্টোরিয়া ঘুরে এসেও এই সবুজ আমাকে আপ্লুত করেছে – এতটাই ঘন এবং গাঢ় এর রঙ এবং রূপ। কেবল পাতার রঙ্গেই নয় বরং বাহারী ফুল এবং ফলে সুশোভিত এই সবুজ। একে আরো প্রানবন্ত করেছে জাপানী ঝিঁঝিঁ পোকা যারা অবিরাম ডেকে চলে দিনে ও রাতে, সারাদেশে একই সুর ও লয়ে। এদের জাপানীরা এত ভালোবাসে যে দেশ ছেড়ে গেলেও মন খারাপ করে এদের জন্য। ঝিঁ ঝিঁ পোকার জন্য এই মন খারাপের গল্প পড়েছিলাম ইংরেজী সাহিত্যে, ইউরোপে বিবাহিত এক জাপানী বধুর স্বীয় ভূমির জন্য বিরহগাঁথায়।
প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝে অবস্থিত রিং অফ ফায়ারের আগ্নেয় তৎপরতাপ্রসূত দেশটির ৭৩% এলাকা পাহাড় এবং জঙ্গলে ছাওয়া। মূলত উপকূলীয় অঞ্চলগুলোই বসতির উপযুক্ত। তারও যতটুকু দেখেছি তা ছিলো উঁচু নীচু পাহাড়ে আবৃত। প্রকৃতিকে কোথাও ক্ষতিগ্রস্ত না করে বরং একে যথাসম্ভব অক্ষত রেখে পাহাড়ের খাঁজে তৈরী করা হয়েছে রাস্তাঘাট। ফলে রাস্তা করতে হয়েছে সরু, অনেক জায়গায় কেবল এক লেইনে, যেখানে পাহাড় পথ রোধ করে দাঁড়িয়েছে সেখানে রাস্তা নির্গত করা হয়েছে পাহাড়ের তলদেশে টানেল করে, তবু পাহাড় কাটা হয়নি। বাড়ীঘর কোথাও পাহাড়ের ওপরে, কোথাও পাহাড়ের পাদদেশে। কিন্তু পথের মোড়ে লুকিয়ে থাকা সরু পথ দিয়ে প্রতিটি বাড়ীতে যাবার ব্যাবস্থা করা হয়েছে। পাহাড়ের ওপর অ্যাপার্টমেন্টগুলোর কিছু কিছু দেখলাম সামনে তিনচারতলা স্টিলের প্ল্যাটফর্ম করে পার্কিং এর ব্যাবস্থা যাতে অল্প জায়গায় বেশী গাড়ি রাখার উপায় হয়।
এত সংকীর্ণ রাস্তা সত্ত্বেও কোথাও কোন হর্ণ নেই, নেই হুড়োহুড়ি বা অ্যাক্সিডেন্ট কারণ জাপানীরা প্রচন্ডরকম ভদ্র এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ জাতি। এই রাস্তাগুলোই জাপানের একমাথা থেকে আরেক মাথা বিস্তৃত হয়ে তৈরী করেছে এর অর্থনৈতিক মেরুদন্ড। জাপানের সরকার গাড়ীর দাম নিয়ন্ত্রণ করে যাতে জনগণের কাছে গাড়ী সহজলভ্য হয়, এর অর্থনৈতিক মেরুদন্ডে পুষ্টির সরবরাহ অব্যাহত থাকে। এর বাইরে রয়েছে মাটির তলদেশে কিংবা মাথার ওপর দিয়ে চলে যাওয়া নানান ধরনের ট্রেন যেগুলো যোগাযোগ ব্যাবস্থাকে করে দিয়েছে এতখানি সহজ যাতে জাপানের এক মাথায় বসবাস করে আরেক মাথায় কাজ করতে পারে জনগন। কাজের কাছাকাছি বাসা নেয়া তখন হয়ে যায় অবান্তর।
সে যাই হোক, সমস্যার মুখোমুখি হতে হোল এয়ারপোর্ট থেকে বেরোবার আগেই যদিও টের পেলাম আরো দু’ঘন্টা পরে। পর পর দু’টো প্লেনে মোট সাড়ে পনেরো ঘন্টা, রিপোর্টিং আর ট্রানজিটে আরো পাঁচ ছয় ঘন্টা মিলিয়ে প্রায় একুশ বাইশ ঘন্টা পর যখন জাপানে অবতরণ করলাম তখন আমরা প্রচন্ড ক্লান্ত। আমরা যখন ছোট ছিলাম তখনকার তুলনায় এখনকার প্লেনগুলোতে বসার ব্যাবস্থা সংকীর্ণ, না যায় বসা না যায় শোওয়া টাইপের। প্লেন থেকে নেমে আরো দু’ঘন্টা বাসে চড়ে যেতে হবে সুজিদো। সেখানে মিসবাহ ভাইয়ের বাসায় আমাদের থাকার ব্যাবস্থা করা হয়েছে। হাফিজ সাহেব এয়ারপোর্টে বাসের টিকেট কাউন্টারে বসা মেয়েটিকে মুখে বলেই ক্ষান্ত হলেন না, নিশ্চিত হবার জন্য লেখাটাও দেখালেন। তারপর আমরা বাসে চেপে বসলাম। সীমাহীন ক্লান্তি, নিবির সবুজের মাঝে এঁকেবঁকে চলা নয়নাভিরাম পথ আর এসির ঠান্ডা হাওয়ার পরশে ঘুম এসে গেল। যেখানে ড্রাইভার আমাদের নামতে বলল সেখানে লেখা শিনজুকু, সে এক জমজমাট শহর! এলোমেলো মনে হওয়াতে যাত্রীদের কাছেও জিজ্ঞেস করলাম। তারাও মাথা দোলালো। কি আর করা? নামার পরই বুঝলাম আমাদের অবস্থা, ‘পথিক তুমি পথ হারাইয়াছ’।
জাপানীরা নিজেদের ভাষা শিখতেই কাহিল হয়ে যায়। হবেনা, যদি এক ভাষার তিনখানা বর্ণমালা থাকে? তখন আর তাদের অন্য ভাষা শেখার আগ্রহ থাকেনা। তাছাড়া ঐতিহাসিকভাবেই তাদের পুরো দেশে মূলত এক জাতিই ছিলো, ফলে অন্য কারো সাথে তাদের তেমন একটা মেলামেশা কিংবা মানিয়ে চলার প্রয়োজন হয়নি। সুতরাং, জাপানে একজন পর্যটক ভাষা না জেনে কোথাও তেমন একটা সাহায্য পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। কেউ তার কথা বুঝবেনা, কোন সাইনবোর্ডও নেই যা সে বুঝতে পারে। তাছাড়া ওদের ভাষায় কেবল কোমল শব্দগুলো বিদ্যমান, নেই ট ঠ ড ঢ এর মত শব্দনিচয়ের ব্যাবহার, এমনকি ল বর্ণটিও নেই। ওরা ‘ল’য়ের পরিবর্তে ‘র’ ব্যাবহার করে। ফলে কেউ ইংরেজী বললেও তাকে ইংরেজী হিসেবে চিনতে পারার জন্য যথেষ্ট মেধার প্রয়োজন। তার ওপর ওদের হসন্ত নেই। তাই বলার মাঝে ব্রেক কষতে গিয়ে শব্দের শেষে ‘ও’ যোগ করতে হয়। ফলে লাইট হয়ে যায় ‘লাইতো’, টোটাল হয়ে যায় ‘তোতোরো’ আর ‘আই লাভ ইউ’ হয়ে যায় ‘আই রাবু’!
তিনখানা মোবাইল সেট কিন্তু সিম নেই, জমজমাট শহরের মধ্যখানে শত শত লোক পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে অথচ কেউ এক বর্ণ ইংরেজী বুঝেনা, ঐ জায়গায় ফ্রি ওয়াই ফাই আছে কিন্তু কানেকশন স্টেবল না, সাথে ছোটবড় মিলিয়ে ষোল পিস লাগেজ সুতরাং সবাই এক ট্যাক্সিতে ওঠা সম্ভব না আবার অপরিচিত জায়গায় আলাদা যাওয়াও ঝুঁকিপূর্ণ, সব মিলিয়ে নানাবিধ ঝক্কি ঝামেলার পর ভাইবারে যোগাযোগ স্থাপন করে মিসবাহ ভাইকে জানিয়ে প্রায় তিন চার ঘন্টা পর ঐ এলাকায় অবস্থানরত এক বাংলাদেশী ভাই এসে দু’টো ট্যাক্সিকে জাপানী ভাষায় ঠিকানা বুঝিয়ে দিয়ে আমাদের তুলে দিলেন। এক ট্যাক্সিতে আমি, আরেক ট্যাক্সিতে হাফিজ সাহেব।
ট্যাক্সিতে ড্রাইভারের সাথে কিছু কথাবার্তা হোল। বুঝলাম, কোন ভাষার কিছু শব্দ জানা এবং তা দিয়ে বোধগম্য বাক্য গঠন করতে পারার মাঝে অনেক তফাত। বুঝা এবং বলার মাঝেও অনেক দুরত্ব। আমি অবশ্য কথা বলছিলাম যেন ঘুমিয়ে না পড়ি সেজন্য। কিন্তু জোরপূর্বক জেগে থাকার মাঝেও পাহাড় কাটার পরিবর্তে পথ করে নেয়ার জন্য নির্মিত দীর্ঘ টানেলগুলো দেখে অবাক হচ্ছিলাম।
গন্তব্যে পৌঁছে আবিষ্কার করলাম জাপানের আরেক মজার জিনিস। বসবাসযোগ্য ভূমির পরিমাণ কম হওয়াতে এখানে আবাসিক এলাকাগুলো ঘন বসতিপূর্ণ এবং ঘরগুলো অকল্পনীয়ভাবে ছোট জায়গায় সর্বোচ্চ ব্যাবহারের উপযোগী করে তৈরী করা। এক বাড়ীতে এক পরিবার থাকাই মুশকিল, সেখানে মেহমান রাখা সম্ভব না। ফলে অতিথিপরায়ন মিসবাহ ভাই মেহমানদের অপ্যায়ন করার জন্য বাসার কাছাকাছি আরেকটি বাড়ী রেখেছেন। টোকিওতে এমন বাড়ীও আছে যেখানে এক রুমে রান্না খাওয়া বসা শোয়া সবই ব্যাবস্থা করা যায়। এই অঞ্চলটি অপেক্ষাকৃত দূরবর্তী হওয়ায় এখানে দু’টি বেডরুম, একটি রান্নাঘর, একটি খাবার/বসার ঘর এবং তিনভাগে বিন্যস্ত একটি বাথরুম রয়েছে। সেদিক থেকে এটি অত্যাধুনিক এবং বিলাসবহুল একটি বাড়ী। জাপানীরা জীবনযাত্রাকে আরামদায়ক করতে প্রযুক্তিকে এমনভাবে জীবনের সাথে জড়িয়ে নিয়েছে যে প্রতি রুমে লাইট কিংবা এসি অন অফ করার জন্য সুইচের পরিবর্তে রিমোট কন্টোল ব্যাবহার করা হয়, এমনকি আলোর তীব্রতাও নিয়ন্ত্রণ করা যায়। কোথাও কোথাও টয়লেটের ডালা খোলা থেকে ফ্লাশ করা পর্যন্ত স্বয়ংক্রিয় করে দেয়া হয়েছে। ওদের জীবনে আসবাবপত্রের প্রয়োজনীয়তা এবং ব্যাবহার যৎসামান্য এবং মাদুর পাতা ঘরগুলোতে তারা বিছানাও ব্যাবহার করেনা। কিন্তু আমরা যে ঘরে ছিলাম সেটি মাদুর পাতা হওয়া সত্ত্বেও ম্যাট্রেস বিছানো ছিলো।
এই ঘরের আরেক অধিবাসী ছিলো আরিফ। সে ছিলো আমার চতুর্থ ননদ রিমির ক্লাসমেট। অসম্ভব ভদ্র এবং অতিথিপরায়ন ছেলেটি আমাদের জিনিসপত্র টেনে তুলতে সাহায্য করলো, ঘুমন্ত রিহামকে তুলে বিছানায় দিয়ে এলো। মিসবাহ ভাই তখন শহরের বাইরে। ভাবী বেচারী আমাদের জন্য রান্না করে পাঠিয়েছিলেন যদিও এই বাসায় রান্নার সমস্ত ব্যাবস্থা ছিলো, আরো ছিলো ফ্রিজভর্তি নানানরকম খাবার। তখন জাপান সময় রাত সাড়ে এগারোটা। কোনরকমে নামাজ পড়ে শুয়ে পড়লাম।
সকালে উঠে নাস্তা খেয়ে আরিফের সাথে সী প্যারাডাইসে রওয়ানা হলাম। ইয়োকোহামার হাক্কেজিমা এলাকায় সমুদ্রের পারে বিশাল জায়গা নিয়ে অবস্থিত এই পার্কটি। ম্যাপ দেখে টের পেলাম পুরোটা একদিনে দেখে শেষ করা সম্ভব নয়। সিদ্ধান্ত হোল আগে অ্যাকুয়ারিয়ামটি দেখে নেব, তারপর যা দেখা যায়। আসার আগে ক্যানাডায় টরোন্টো এবং ভ্যাঙ্কুভারে এবং অ্যামেরিকায় অরল্যান্ডোর সী ওয়ার্ল্ডে অ্যাকুয়ারিয়াম দেখে এসেছি। শেষেরটি কোনভাবেই উল্লেখযোগ্য নয়, তাই হিসেব থেকে বাদ দিলাম। হাক্কেজিমার অ্যাকুয়ারিয়াম দেখে মনে হোল এটি ভ্যাঙ্কুভারের চেয়ে ভালো, কিন্তু অদ্যাবধি টরোন্টোরটিই সেরা। সাধারনত অ্যাকুয়ারিয়ামগুলোতে কেবল সামুদ্রিক প্রানী থাকে। কিন্তু এখানে পোলার বেয়ার, ওয়ালরাস জাতীয় সীল, সামুদ্রিক কচ্ছপ এমন অনেক উভচর প্রানীও ছিলো। ভালো লেগেছে বিশাল ট্যাঙ্ক বানিয়ে সমুদ্রে ছোট ছোট মাছের ঝাঁকের মাঝে হাঙ্গর এবং রে মাছগুলো যেভাবে মিশে থাকে তার নমুনা। হাজার হাজার রূপালী মছের ঝাঁক একসাথে সাঁতার কাটতে কাটতে হঠাৎ করেই দিক বদলায়, কি যে অসাধারন লাগে দেখতে! এর ভেতর হাঙ্গরগুলো চুপচাপ লুকিয়ে যায়। তারপর আচমকা মাছেদের পর্দা ভেদ করে সামনে এসে হাজির হয়। আর এই প্রথম দেখলাম ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতির ডলফিন। ওদের তিমির প্রজাতিও ছিলো অনেক বেশি। অ্যাকুয়ারিয়ামের বাইরে আরো ছোট ছোট ট্যাঙ্কে ছিলো নানান পরিবেশে, নানান দেশে যেসব মাছ পাওয়া যায় তার নমুনা। বাংলাদেশী মাছের ট্যাঙ্কও ছিলো, শাপলায় ছাওয়া!
অ্যাকুয়ারিয়াম দেখে মন ভরে গেল। ক্যাল্গেরীতে মাইনাস তাপমাত্রায় অভ্যস্ত শরীরে কিছুতেই বাইরের গরম সহ্য হচ্ছিলোনা। নামাজের সময় হয়ে আসছিলো, সিদ্ধান্ত নিলাম বাসায় ফিরে যাব। জানা গেল এখানে একটি ডলফিন শো হয়। বাচ্চারা লাফিয়ে উঠলো। গিয়ে দেখি বিশাল ট্যাঙ্কের সামনের দিকে দর্শকরা, পেছন দিকে ট্রেনাররা। ট্যাঙ্কের ভেতর প্রকান্ড ওয়েল শার্ক মনের আনন্দে সাঁতরে বেড়াচ্ছে। ওয়েল শার্ক আমার মত অলস টাইপের প্রানী। সে কি করে দেখাবে? কিছুক্ষণ পরে তিনটি সীল এসে ট্রেনার সাইড থেকে দর্শক সাইডে সাঁতরে উঠলো। তারপর তারা ট্রেনারদের সাথে বল নিয়ে নানান কসরত দেখাতে লাগলো। ওরা চলে গেলে একটি ওয়ালরাস ডানদিকের একটি দরজা খুলে ট্যাঙ্কের ভেতর সাঁতরে দর্শকদের সামনে উঠে এলো। ওখানে একটি মাইক সেট করে ছিলো। সে মাইক বরাবর মুখ রেখে শরীর নেড়ে নেড়ে কথা বলার ভঙ্গী করতে লাগলো। একই সময় লাউডস্পিকারে মানুষের গলায় ঘোষনা হোল, ‘এবার শুরু হবে আসল খেলা!’ ওয়ালরাসটিকে এমনভাবে ট্রেনিং দেয়া হয়েছিলো, এমন নিখুঁতভাবে সে মুখ নাড়াচ্ছিলো এবং অঙ্গভঙ্গি করছিলো যে দেখে মনে হচ্ছিল সেই কথা বলছে! বাচ্চারা তো হাসতে হাসতে শেষ! কথা শেষে সে আবার ট্যাঙ্কের ভেতর সাঁতরে দরজার দিকে উঠে দরজা বন্ধ করে চলে গেল, কোন ট্রেনার ছাড়াই!
এরপর এলো দু’টো শ্বেত বালুগা তিমি। ওদের আগে দেখেছি। কিন্তু কিলার ওয়েল ব্যাতীত তিমি জাতীয় অন্য প্রানীরা খেলা দেখাতে পারে আমার জানা ছিলোনা। ওরা দু’জন দুই ট্রেনারকে নিয়ে তীব্র বেগে সাঁতরে পানির ওপর লাফিয়ে উঠতে লাগলো। সে এক বিস্ময়কর ব্যাপার! ওরা চলে গেলে একটা ছোটখাটো কমেডি হোল। একজন ট্রেনার পেঙ্গুইনের পোশাক পরে সিঁড়ির পেছনে গিয়ে লুকালো, কিছুক্ষণ পর সিঁড়ির পেছনে থেকে গুটি গুটি পায়ে ট্রেনারদের দরজার দিকে ছুটলো একটা আসল পেঙ্গুইন! এরপর এলো তিনটা ধূসর ডলফিন যা আমরা সচরাচর দেখে থাকি আর তিনটা সাদাকালো। ওরা ঝাঁকে সাঁতার কেটে পানি থেকে লাফিয়ে উঠলো, লেজ দিয়ে পানি ছিটিয়ে ট্যাঙ্কের কাছাকাছি লোকজনকে ভিজিয়ে দিলো, শূন্যে লাফিয়ে উঠে ঝুলন্ত বলে লেজ দিয়ে বাড়ি দিলো, আরো কত কি! হুমম, শেষ পর্যন্ত ওয়েল শার্কটা মনের আনন্দে সাঁতার কাটা ছাড়া আর কিছুই করলোনা, কিন্তু ওর আকার দেখেই আমরা বেশ আনন্দ পেলাম। পরিশেষে পরিতৃপ্তির সাথে সবাই বাড়ী ফিরে এলাম। অরল্যান্ডোর সী ওয়ার্ল্ডে কিলার ওয়েলের খেলা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম, কি অসাধারন প্রানী আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন! কিন্তু একসাথে এত প্রানীর মহড়া আমরা আর কোথাও দেখিনি।
পরদিন মিসবাহ ভাই কাজ সেরে অন্য শহর থেকে ফিরে এলেন। দুপুরে আমরা তাঁর বাসায় খেলাম। অত্যন্ত ব্যায়বহুল হওয়াতে কিছু কিছু ভাই মাঝে মাঝে জাপানে এলেও পরিবারসহ লোকজন আসে খুব কম। এতদিন পর একটি পরিবার পেয়ে ভাবী বাচ্চারা খুব খুশি। তাঁদের চার সন্তানের মাঝে বড় তিনটি সন্তান রিহামের বয়সের কাছাকাছি, সে একসাথে তিন তিনটি বন্ধু পেয়ে গেল! বিকালে আমরা একত্রে এনোশিমা সমুদ্র সৈকতে গেলাম। আকাশে ভারী মেঘ ছিলো। এখানে মেঘগুলো সাগর থেকে উত্থিত হয়ে যখন সাগরপারে পৌঁছয় তখনো খুব বেশি উচ্চতায় যায়না। জনবসতি যেহেতু সাগরের পার থেকে বেশিদূর বিস্তৃত হতে পারেনি, মেঘগুলো সবসময় মনে হয় ধরাছোঁয়ার মধ্যেই। বসতি যেহেতু অধিকাংশ স্থানে উচ্চতায় অবস্থিত, হাল্কা বাতাসে মেঘেদের ছুটোছুটি দেখে মন ভালো হয়ে যায়। বাতাসে প্রশান্ত মহাসাগরে অশান্ত ঢেউ দেখা দিয়েছিলো। বাঁধের পাশে এক পাহাড় সবুজ বৃক্ষ বাতাসে দুলে দুলে সাগরের আরশীতে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নিজেদের দেখছিলো। বৃক্ষলতাদির আদরে সুশীতল বাতাস শরীর জুড়িয়ে দিচ্ছিলো। সাথে ছিলো ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। আমার মনে হচ্ছিলো এই দৃশ্য আমি হাজার বছর ধরে দেখেও ক্লান্ত হবনা। বৃষ্টির কারণে খুব দ্রুত আমাদের স্থানত্যাগ করতে হয়। তবু মন খারাপ হোলনা। ক্ষণিকের তরে যা ভালো লাগে, স্মৃতিতে তা বার বার নতুন করে ধরা দেয়, সেই ভালো লাগা ম্লান হয়না।
– Rehnuma Bint Anis

The post জাপান সফর – পর্ব ১ appeared first on ইসলামিক অনলাইন মিডিয়া.



from ইসলামিক অনলাইন মিডিয়া https://ift.tt/2ROqDHA

No comments

Powered by Blogger.