Header Ads

অর্থ উপার্জনে - ইসলামি দ্রিষ্টিকোন

ﺇﻥ ﺍﻟﺤﻤﺪ ﻟﻠﻪ ﻭﺍﻟﺼﻼﺓ ﻭﺍﻟﺴﻼﻡ ﻋﻠﻰ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﻭﻋﻠﻰ ﺁﻟﻪ ﻭﺻﺤﺒﻪ ﺃﺟﻤﻌﻴﻦ ﺃﻣﺎ ﺑﻌﺪ :
অর্থ-সম্পদ আল্লাহ তা‘আলার অন্যতম নিয়ামাত। এ নিয়ামাত
অর্জন করার জন্য রয়েছে নানাবিধ ব্যবস্থা। বেঁচে থাকার জন্য
কোনো না কোনো পর্যায়ে অর্থসম্পদের প্রয়োজন পড়ে। মানবজীবনে
এটি শরীরের রক্তের সাথে তুলনাযোগ্য। জীবনকে স্বার্থক করার
ক্ষেত্রে উপার্জন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মানুষ
অনেক কিছু করতে চায়, কিন্তু উপার্জন তাকে নিয়ন্ত্রণ করে।
উপার্জনের উপর নির্ভর করে ব্যক্তির অর্থ-সম্পদ অর্জিত হয়। এটি
বাস্তব এবং খুবই প্রয়োজনীয় বিষয়। উপার্জন করার ক্ষেত্রে কী
করণীয় রয়েছে এবং কী বর্জন করতে হবে সে বিষয়ে আলোকপাত করা
হয়েছে এই প্রবন্ধে।
1. উপার্জন বলতে কী বুঝায়
উপার্জন শব্দটির সমর্থক শব্দসমূহ হচ্ছে আয়, রোজগার, কামাই, লাভ,
প্রাপ্তি, সংগ্রহ, অর্জন ইত্যাদি।[1] আরবীতে ﺍﻟﻜﺴﺐ এবং ইংরেজীতে
বলা হয় Income.
পরিভাষায় উপার্জন হলো: জীবন পরিচালনার জন্য বিভিন্ন মাধ্যমে
সম্পদ অর্জন করা।
অন্যভাবে বলা যায় যে, Income isthe monetary payment received for
goods or services, or from other sources, as rents or investments.[2]
2. মানবজীবনে উপার্জনের প্রয়োজনীয়তা
ক. জীবন পরিচালনার জন্য উপার্জন আবশ্যকীয় বিষয়
জীবন ধারণ করার জন্য উপার্জনে সক্ষম প্রত্যেককে উপার্জন করতে
হবে। উপার্জন ছাড়া পৃথিবীতে বসবাস করা সম্ভব নয়। উপার্জন না
করে বসে থাকার কোনো সুযোগ নেই। আর তাই দেখা যায় যে সালাত
শেষ হওয়ার পর উপার্জনে বের হওয়ার কথা আল-কুরআনে বলা
হয়েছে। আল্লাহ বলেন,
﴿ ﻓَﺈِﺫَﺍ ﻗُﻀِﻴَﺖِ ﭐﻟﺼَّﻠَﻮٰﺓُ ﻓَﭑﻧﺘَﺸِﺮُﻭﺍْ ﻓِﻲ ﭐﻟۡﺄَﺭۡﺽِ ﻭَﭐﺑۡﺘَﻐُﻮﺍْ ﻣِﻦ ﻓَﻀۡﻞِ ﭐﻟﻠَّﻪِ ﻭَﭐﺫۡﻛُﺮُﻭﺍْ ﭐﻟﻠَّﻪَ ﻛَﺜِﻴﺮٗﺍ
ﻟَّﻌَﻠَّﻜُﻢۡ ﺗُﻔۡﻠِﺤُﻮﻥَ ١٠ ﴾ ‏[ﺍﻟﺠﻤﻌﺔ : ١٠‏]
‘‘অতঃপর যখন সালাত সমাপ্ত হবে তখন তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে
পড় আর আল্লাহর অনুগ্রহ হতে অনুসন্ধান কর এবং আল্লাহকে বেশি
বেশি স্মরণ কর, যাতে তোমরা সফল হতে পার। ’’[3]
খ. পৃথিবী উপার্জন করার একমাত্র ক্ষেত্র
আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে শুধু সৃষ্টিই করেননি, জীবন পরিচালনার
জন্য এ পৃথিবীকে কর্মক্ষেত্র করে দিয়েছেন। সে সাথে উপার্জন
করার জন্য অসংখ্য ক্ষেত্রের ব্যবস্থা করেছেন। আল্লাহ বলেন,
﴿ ﻫُﻮَ ﭐﻟَّﺬِﻱ ﺟَﻌَﻞَ ﻟَﻜُﻢُ ﭐﻟۡﺄَﺭۡﺽَ ﺫَﻟُﻮﻟٗﺎ ﻓَﭑﻣۡﺸُﻮﺍْ ﻓِﻲ ﻣَﻨَﺎﻛِﺒِﻬَﺎ ﻭَﻛُﻠُﻮﺍْ ﻣِﻦ ﺭِّﺯۡﻗِﻪِۦۖ ﻭَﺇِﻟَﻴۡﻪِ ﭐﻟﻨُّﺸُﻮﺭُ ١٥
﴾ ‏[ ﺍﻟﻤﻠﻚ : ١٥‏]
‘‘তিনিই তো তোমাদের জন্য যমীনকে সুগম করে দিয়েছেন, কাজেই
তোমরা এর পথে-প্রান্তরে বিচরণ কর এবং তাঁর রিয্ক থেকে তোমরা
আহার কর। আর তাঁর নিকটই পুনরুত্থান।’’ [4]
গ. পরিবারিক দায়িত্ব পালন করা
প্রত্যেক ব্যক্তিই পরিবারের সদস্য। তাই পরিবারিক দায়িত্ব পালনে
তাকে উপার্জন করতে হয়। পরিবারে খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানসহ
অন্যান্য মৌলিক চাহিদা রয়েছে, যা উপার্জন করে মেটাতে হয়। এ
বিষয়ে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿ﻭَﻋَﻠَﻰ ﭐﻟۡﻤَﻮۡﻟُﻮﺩِ ﻟَﻪُۥ ﺭِﺯۡﻗُﻬُﻦَّ ﻭَﻛِﺴۡﻮَﺗُﻬُﻦَّ ﺑِﭑﻟۡﻤَﻌۡﺮُﻭﻑِۚ﴾ ‏[ ﺍﻟﺒﻘﺮﺓ: ٢٣٣ ‏]
‘‘আর সন্তানের পিতার উপর কর্তব্য, বিধি মোতাবেক মায়েদেরকে
খাবার ও পোশাক প্রদান করা।’’ [5]
ঘ. উপার্জন করার ক্ষমতা দুনিয়ার কল্যাণকর বিষয়
উপার্জন করার যোগ্যতা একটি কল্যাণকর বিষয়। এটা আল্লাহর এক
বিশেষ নিয়ামাত। আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে চিন্তা, বুদ্ধি ও
বিবেক দিয়েছেন, দু’টি হাত দিয়েছেন। যাতে স্বাবলম্বী হওয়া যায়।
অপরের নিকট হাত পাততে না হয়। উপার্জন করার মত কল্যাণকর
বিষয়ে দু‘আ করার ভাষা শিক্ষা দেওয়া হয়েছে আল-কুরআনে,
﴿ ﻭَﻣِﻨۡﻬُﻢ ﻣَّﻦ ﻳَﻘُﻮﻝُ ﺭَﺑَّﻨَﺎٓ ﺀَﺍﺗِﻨَﺎ ﻓِﻲ ﭐﻟﺪُّﻧۡﻴَﺎ ﺣَﺴَﻨَﺔٗ ﻭَﻓِﻲ ﭐﻟۡﺄٓﺧِﺮَﺓِ ﺣَﺴَﻨَﺔٗ ﻭَﻗِﻨَﺎ ﻋَﺬَﺍﺏَ ﭐﻟﻨَّﺎﺭِ ٢٠١
﴾ ‏[ ﺍﻟﺒﻘﺮﺓ: ٢٠١ ‏]
‘‘আর তাদের মধ্যে এমনও আছে, যারা বলে, হে আমাদের রব,
আমাদেরকে দুনিয়াতে কল্যাণ দিন আর আখেরাতেও কল্যাণ দিন
এবং আমাদেরকে আগুনের আযাব থেকে রক্ষা করুন।’’ [6]
ঙ. স্বাবলম্বী হওয়ার মাধ্যম
ইসলাম অপরের উপর নির্ভর করে জীবন পরিচালনার বিষয়ে
নিরুৎসাহিত করেছে। এ মর্মে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি
ওয়াসাল্লাম বলেন,
‏«ﻟَﺎ ﺗَﺰَﺍﻝُ ﺍﻟْﻤَﺴْﺄَﻟَﺔُ ﺑِﺄَﺣَﺪِﻛُﻢْ ﺣَﺘَّﻰ ﻳَﻠْﻘَﻰ ﺍﻟﻠﻪَ، ﻭَﻟَﻴْﺲَ ﻓِﻲ ﻭَﺟْﻬِﻪِ ﻣُﺰْﻋَﺔُ ﻟَﺤْﻢٍ ‏»
‘‘তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি সর্বদা মানুষের কাছে চেয়ে বেড়ায় সে
কিয়ামতের দিন এমন অবস্থায় আগমন করবে যে, তার মুখমন্ডলে এক
টুকরো গোশতও থাকবে না।’’ [7]
চ. উত্তরাধিকারীদের স্বচ্ছল রেখে যাওয়ার উপায়
সা‘দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নবী
সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে এভাবে বলেছেন,
‏« ﺇِﻧَّﻚَ ﺃَﻥْ ﺗَﺪَﻉَ ﻭَﺭَﺛَﺘَﻚَ ﺃَﻏْﻨِﻴَﺎﺀَ ﺧَﻴْﺮٌ ﻣِﻦْ ﺃَﻥْ ﺗَﺪَﻋَﻬُﻢْ ﻋَﺎﻟَﺔً ﻳَﺘَﻜَﻔَّﻔُﻮﻥَ ﺍﻟﻨَّﺎﺱَ ﻓِﻲ ﺃَﻳْﺪِﻳﻬِﻢْ ‏»
‘‘তোমাদের সন্তান সন্তুতিদেরকে সক্ষম ও সাবলম্বী রেখে যাওয়া,
তাদেরকে অভাবী ও মানুষের কাছে হাত পাতা অবস্থায় রেখে
যাওয়ার চেয়ে উত্তম।’’ [8]
3. উপার্জনের প্রকারভেদ
আল্লাহ তা‘আলা তাঁর সমগ্র সৃষ্টিকে মানুষের খাদেম করেছেন। মানুষ
নির্দেশিত পথে তা থেকে উপার্জন বা সম্পদ আহরণ করবে। ইসলাম
এমন একটি জীবন বিধান যা কোনটি হালাল আর কোনটি হারাম তা
স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে। সেজন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
‏«ﺍﻟﺤَﻼَﻝُ ﺑَﻴِّﻦٌ، ﻭَﺍﻟﺤَﺮَﺍﻡُ ﺑَﻴِّﻦٌ، ﻭَﺑَﻴْﻨَﻬُﻤَﺎ ﻣُﺸَﺒَّﻬَﺎﺕٌ ﻻَ ﻳَﻌْﻠَﻤُﻬَﺎ ﻛَﺜِﻴﺮٌ ﻣِﻦَ ﺍﻟﻨَّﺎﺱِ، ﻓَﻤَﻦِ ﺍﺗَّﻘَﻰ
ﺍﻟﻤُﺸَﺒَّﻬَﺎﺕِ ﺍﺳْﺘَﺒْﺮَﺃَ ﻟِﺪِﻳﻨِﻪِ ﻭَﻋِﺮْﺿِﻪِ، ﻭَﻣَﻦْ ﻭَﻗَﻊَ ﻓِﻲ ﺍﻟﺸُّﺒُﻬَﺎﺕِ : ﻛَﺮَﺍﻉٍ ﻳَﺮْﻋَﻰ ﺣَﻮْﻝَ ﺍﻟﺤِﻤَﻰ، ﻳُﻮﺷِﻚُ
ﺃَﻥْ ﻳُﻮَﺍﻗِﻌَﻪُ ‏»
‘‘হালাল বা বৈধ সুস্পষ্ট এবং হারাম বা অবৈধও স্পষ্ট আর এ দু’এর
মধ্যবর্তী বিষয়গুলো হলো সন্দেহজনক। আর বেশীরভাগ লোকই
সেগুলো (সম্পর্কে সঠিক পরিচয়) জানে না। অতএব যে ব্যক্তি ঐ
সন্দেহজনক জিনিসিগুলোকে পরিহার করলো সে তার দ্বীন ও মান-
সম্মানকে পবিত্র রাখলো। আর যে ব্যক্তি সন্দেহের মাঝে পতিত
হলো তার উদাহরণ ঐ রাখালের মত যে পশু চরায় সংরক্ষেত ভুমির
সীমানায় এমনভাবে যে, যে কোনো সময় সে তাতে প্রবেশ করবে।’’।[9]
আলোচ্য হাদীস থেকে বুঝা যায় উপার্জন দুই ধরণের। ক. হালাল
উপার্জন খ. হারাম উপার্জন।
· হালাল উপার্জন
এটা আল্লাহ তা‘আলার বান্দার প্রতি বিশেষ অনুগ্রহ যে, তিনি
বান্দার জন্য জমীনে উপার্জন করার বিরাট ক্ষেত্র তৈরি করে
দিয়েছেন। তিনি আমাদের কল্যাণে অগণিত সেক্টর তৈরি করেছেন।
﴿ﻣَﺎ ﻳُﺮِﻳﺪُ ﭐﻟﻠَّﻪُ ﻟِﻴَﺠۡﻌَﻞَ ﻋَﻠَﻴۡﻜُﻢ ﻣِّﻦۡ ﺣَﺮَﺝٖ ﻭَﻟَٰﻜِﻦ ﻳُﺮِﻳﺪُ ﻟِﻴُﻄَﻬِّﺮَﻛُﻢۡ ﻭَﻟِﻴُﺘِﻢَّ ﻧِﻌۡﻤَﺘَﻪُۥ ﻋَﻠَﻴۡﻜُﻢۡ ﻟَﻌَﻠَّﻜُﻢۡ
ﺗَﺸۡﻜُﺮُﻭﻥَ ٦ ﴾ ‏[ ﺍﻟﻤﺎﺋﺪﺓ : ٦‏]
‘‘আল্লাহ তোমাদের উপর কোনো সমস্যা সৃষ্টি করতে চান না, বরং
তিনি চান তোমাদের পবিত্র করতে এবং তার নিআমত তোমাদের উপর
পূর্ণ করতে, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন কর।[10]
3.1. হালাল উপার্জনের গুরুত্ব ও ফযিলাত
ক. হালাল উপার্জন একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদাত
আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে তার ইবাদাতের জন্য সৃষ্টি করেছেন।
বান্দাহ যেসব ইবাদাত করে থাকে হালাল উপার্জন তার মধ্যে একটি
গুরুত্বপূর্ণ ইবাদাত। এ বিষয়ে কুরআনে বলা হয়েছে,
﴿ﻓَﭑﺑۡﺘَﻐُﻮﺍْ ﻋِﻨﺪَ ﭐﻟﻠَّﻪِ ﭐﻟﺮِّﺯۡﻕَ ﻭَﭐﻋۡﺒُﺪُﻭﻩُ ﻭَﭐﺷۡﻜُﺮُﻭﺍْ ﻟَﻪُۥٓۖ ﺇِﻟَﻴۡﻪِ ﺗُﺮۡﺟَﻌُﻮﻥَ ١٧ ﴾ ‏[ ﺍﻟﻌﻨﻜﺒﻮﺕ : ١٧‏]
‘‘তাই আল্লাহর কাছে রিয্ক তালাশ কর, তাঁর ইবাদাত কর এবং তাঁর
প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। তাঁরই কাছে তোমাদেরকে প্রত্যাবর্তিত
করা হবে।’’ [11]
খ. উপার্জনের উৎস সম্পর্কে কিয়ামাতে জিজ্ঞাসা করা হবে
কিয়ামতের দিন আদম সন্তানকে তার উপার্জনের উৎস সম্পর্কে
জবাবদিহি করতে হবে। সেজন্য মুমিনের জন্য হালাল উপার্জন একটি
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ বিষয়ে হাদীসে উল্লেখ আছে, আব্দুল্লাহ ইবনে
মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন,
‏«ﻟَﺎ ﺗَﺰُﻭﻝُ ﻗَﺪَﻡُ ﺍﺑْﻦِ ﺁﺩَﻡَ ﻳَﻮْﻡَ ﺍﻟﻘِﻴَﺎﻣَﺔِ ﻣِﻦْ ﻋِﻨْﺪِ ﺭَﺑِّﻪِ ﺣَﺘَّﻰ ﻳُﺴْﺄَﻝَ ﻋَﻦْ ﺧَﻤْﺲٍ، ﻋَﻦْ ﻋُﻤُﺮِﻩِ ﻓِﻴﻢَ
ﺃَﻓْﻨَﺎﻩُ، ﻭَﻋَﻦْ ﺷَﺒَﺎﺑِﻪِ ﻓِﻴﻢَ ﺃَﺑْﻠَﺎﻩُ، ﻭَﻣَﺎﻟِﻪِ ﻣِﻦْ ﺃَﻳْﻦَ ﺍﻛْﺘَﺴَﺒَﻪُ ﻭَﻓِﻴﻢَ ﺃَﻧْﻔَﻘَﻪُ، ﻭَﻣَﺎﺫَﺍ ﻋَﻤِﻞَ ﻓِﻴﻤَﺎ ﻋَﻠِﻢَ‏»
‘‘কিয়ামতের দিন আদম সন্তানকে পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে এক
কদমও স্বস্থান হতে নড়তে দেওয়া হবে না।
১. তার জীবনকাল কিভাবে অতিবাহিত করেছে,
২. যৌবনের সময়টা কিভাবে ব্যয় করেছে,
৩. ধন সম্পদ কিভাবে উপার্জন করেছে,
৪. তা কিভাবে ব্যয় করেছে,
৫. সে দ্বীনের যতটুকু জ্ঞান অর্জন করেছে সেই অনুযায়ী আমল
করেছে কিনা।’’[12]
গ. ইবাদাত কবুল হওয়ার পূর্বশর্ত
আল্লাহর ইবাদাত করবে অথচ তার উপার্জন হালাল হবে না, এটা
আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য হবে না। অতএব হালাল উপার্জন ইবাদাত
কবুল হওয়ার পূর্বশর্ত। আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত,
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
‏«ﺃَﻳُّﻬَﺎ ﺍﻟﻨَّﺎﺱُ، ﺇِﻥَّ ﺍﻟﻠﻪَ ﻃَﻴِّﺐٌ ﻟَﺎ ﻳَﻘْﺒَﻞُ ﺇِﻟَّﺎ ﻃَﻴِّﺒًﺎ، ﻭَﺇِﻥَّ ﺍﻟﻠﻪَ ﺃَﻣَﺮَ ﺍﻟْﻤُﺆْﻣِﻨِﻴﻦَ ﺑِﻤَﺎ ﺃَﻣَﺮَ ﺑِﻪِ ﺍﻟْﻤُﺮْﺳَﻠِﻴﻦَ،
ﻓَﻘَﺎﻝَ : } ﻳَﺎ ﺃَﻳُّﻬَﺎ ﺍﻟﺮُّﺳُﻞُ ﻛُﻠُﻮﺍ ﻣِﻦَ ﺍﻟﻄَّﻴِّﺒَﺎﺕِ ﻭَﺍﻋْﻤَﻠُﻮﺍ ﺻَﺎﻟِﺤًﺎ، ﺇِﻧِّﻲ ﺑِﻤَﺎ ﺗَﻌْﻤَﻠُﻮﻥَ ﻋَﻠِﻴﻢٌ { ‏[ ﺍﻟﻤﺆﻣﻨﻮﻥ:
51‏] ﻭَﻗَﺎﻝَ : } ﻳَﺎ ﺃَﻳُّﻬَﺎ ﺍﻟَّﺬِﻳﻦَ ﺁﻣَﻨُﻮﺍ ﻛُﻠُﻮﺍ ﻣِﻦْ ﻃَﻴِّﺒَﺎﺕِ ﻣَﺎ ﺭَﺯَﻗْﻨَﺎﻛُﻢْ{ ‏[ﺍﻟﺒﻘﺮﺓ : 172‏] ﺛُﻢَّ ﺫَﻛَﺮَ
ﺍﻟﺮَّﺟُﻞَ ﻳُﻄِﻴﻞُ ﺍﻟﺴَّﻔَﺮَ ﺃَﺷْﻌَﺚَ ﺃَﻏْﺒَﺮَ، ﻳَﻤُﺪُّ ﻳَﺪَﻳْﻪِ ﺇِﻟَﻰ ﺍﻟﺴَّﻤَﺎﺀِ، ﻳَﺎ ﺭَﺏِّ، ﻳَﺎ ﺭَﺏِّ، ﻭَﻣَﻄْﻌَﻤُﻪُ ﺣَﺮَﺍﻡٌ،
ﻭَﻣَﺸْﺮَﺑُﻪُ ﺣَﺮَﺍﻡٌ، ﻭَﻣَﻠْﺒَﺴُﻪُ ﺣَﺮَﺍﻡٌ، ﻭَﻏُﺬِﻱَ ﺑِﺎﻟْﺤَﺮَﺍﻡِ، ﻓَﺄَﻧَّﻰ ﻳُﺴْﺘَﺠَﺎﺏُ ﻟِﺬَﻟِﻚَ؟ ‏»
‘‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র। তিনি শুধু পবিত্র বস্তুই গ্রহণ
করেন। তিনি মু’মিনদের সেই আদেশই দিয়েছেন, যে আদেশ তিনি
দিয়েছিলেন রাসূলগণের।’’ আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘‘হে ইমানদারগণ
তোমরা পবিত্র বস্তু-সামগ্রী আহার কর, যেগুলো আমি তোমাদেরকে
রুযী হিসেবে দান করেছি।’’ অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করলেন, যে
দীর্ঘ সফরে থাকা অবস্থায় এলোমেলো চুল ও ধূলি-ধুসরিত ক্লান্ত-
শ্রান্ত বদনে আকাশের দিকে আল্লাহর দরবারে হাত তুলে প্রার্থনা
করে ডাকছে, হে আমার রব, হে আমার রব অথচ সে যা খায় তা হারাম,
যা পান করে তা হারাম, যা পরিধান করে তা হারাম এবং হারামের
দ্বারা সে পুষ্টি অর্জন করে। সুতরাং তার প্রার্থনা কীভাবে কবুল
হবে?।’’[13]
ঘ. হালাল উপার্জন করা আল্লাহর পথে বের হওয়ার শামিল
হালাল উপার্জন করার জন্য প্রয়োজনে বিদেশেও যেতে হতে পারে।
সেজন্য এটিকে কুরআন মাজীদে আল্লাহর রাস্তায় বের হওয়ার সাথে
হালাল উপার্জনকে বর্ণনা করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন,
﴿ﻭَﺀَﺍﺧَﺮُﻭﻥَ ﻳَﻀۡﺮِﺑُﻮﻥَ ﻓِﻲ ﭐﻟۡﺄَﺭۡﺽِ ﻳَﺒۡﺘَﻐُﻮﻥَ ﻣِﻦ ﻓَﻀۡﻞِ ﭐﻟﻠَّﻪِ ﻭَﺀَﺍﺧَﺮُﻭﻥَ ﻳُﻘَٰﺘِﻠُﻮﻥَ ﻓِﻲ ﺳَﺒِﻴﻞِ ﭐﻟﻠَّﻪِۖ
﴾ ‏[ ﺍﻟﻤﺰﻣﻞ : ٢٠‏]
‘‘আর কেউ কেউ আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধানে পৃথিবীতে ভ্রমণ করবে,
আর কেউ কেউ আল্লাহর পথে লড়াই করবে।’’[14]
ঙ. হালাল উপার্জন আখেরাত বিমুখিতা নয়
আল্লাহ তা‘আলা তার বান্দাদেরকে এ দুনিয়াতে হালাল উপার্জন
করার ক্ষেত্র তৈরি করে দিয়েছেন। সেজন্য উপার্জন করতে
বৈধভাবে চাকুরী, ব্যবসায়-বাণিজ্য বা অন্য কিছু করা আখেরাত
বিমুখতা নয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿ ﻭَﭐﺑۡﺘَﻎِ ﻓِﻴﻤَﺎٓ ﺀَﺍﺗَﻯٰﻚَ ﭐﻟﻠَّﻪُ ﭐﻟﺪَّﺍﺭَ ﭐﻟۡﺄٓﺧِﺮَﺓَۖ ﻭَﻟَﺎ ﺗَﻨﺲَ ﻧَﺼِﻴﺒَﻚَ ﻣِﻦَ ﭐﻟﺪُّﻧۡﻴَﺎۖ ﻭَﺃَﺣۡﺴِﻦ ﻛَﻤَﺎٓ ﺃَﺣۡﺴَﻦَ ﭐﻟﻠَّﻪُ
ﺇِﻟَﻴۡﻚَۖ ﻭَﻟَﺎ ﺗَﺒۡﻎِ ﭐﻟۡﻔَﺴَﺎﺩَ ﻓِﻲ ﭐﻟۡﺄَﺭۡﺽِۖ ﺇِﻥَّ ﭐﻟﻠَّﻪَ ﻟَﺎ ﻳُﺤِﺐُّ ﭐﻟۡﻤُﻔۡﺴِﺪِﻳﻦَ ٧٧ ﴾ ‏[ ﺍﻟﻘﺼﺺ : ٧٧‏]
‘‘আর আল্লাহ তোমাকে যা দান করেছেন তাতে তুমি আখিরাতের
নিবাস অনুসন্ধান কর। তবে তুমি দুনিয়া থেকে তোমার অংশ ভুলে
যেয়ো না। তোমার প্রতি আল্লাহ যেরূপ অনুগ্রহ করেছেন তুমিও
সেরূপ অনুগ্রহ কর। আর যমীনে ফাসাদ করতে চেয়ো না। নিশ্চয়
আল্লাহ ফাসাদকারীদের ভালবাসেন না।’’ [15]
চ. হালাল উপার্জন জান্নাত লাভের উপায়
মানুষের দু’টি জীবন রয়েছে, একটি দুনিয়ায়, অপরটি আখেরাতে।
অতএব হালাল পন্থায় উপার্জনকারী দুনিয়াতে কখনও সমস্যায়
থাকলেও আখেরাতে জান্নাতে যাবে। এ বিষয়ে হাদিসে এসেছে, আবু
সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
‏«ﻣَﻦْ ﺃَﻛَﻞَ ﻃَﻴِّﺒًﺎ، ﻭَﻋَﻤِﻞَ ﻓِﻲ ﺳُﻨَّﺔٍ، ﻭَﺃَﻣِﻦَ ﺍﻟﻨَّﺎﺱُ ﺑَﻮَﺍﺋِﻘَﻪُ ﺩَﺧَﻞَ ﺍﻟﺠَﻨَّﺔَ ‏»
‘‘যে ব্যক্তি হালাল উপার্জিত খাবার খায় ও সুন্নাতের উপর আমল
করে এবং মানুষ তার অনিষ্ট থেকে নিরাপদ থাকে সে জান্নাতে
প্রবেশ করবে’’। [16]
ছ. হালাল উপার্জন অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্জন
পৃথিবীর জীবন নির্বাহে হালাল উপার্জন করার সুযোগ বা যোগ্যতা
লাভ করা আল্লাহ তাআ’লার অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিয়ামাত। সেজন্য
হালাল পন্থায় উপার্জনকারী পরকালে জান্নাতে যাবে। আর অবৈধ
পন্থায় উপার্জনকারী ব্যক্তি দুনিয়ার জীবনে সম্পদের পাহাড়
গড়লেও পরকালীন জীবনে তার জন্য ভয়াবহ আযাব ও শাস্তি
অপেক্ষা করছে। হাদীসে এসেছে,
‏«ﺃﺭﺑﻊ ﺇﺫﺍ ﻛﻦ ﻓﻴﻚ ﻓﻼ ﻋﻠﻴﻚ ﻣﺎ ﻓﺎﺗﻚ ﻣﻦ ﺍﻟﺪﻧﻴﺎ ﺣﻔﻆ ﺃﻣﺎﻧﺔ ﻭﺻﺪﻕ ﺣﺪﻳﺚ ﻭﺣﺴﻦ ﺧﻠﻴﻘﺔ
ﻭﻋﻔﺔ ﻓﻲ ﻃﻌﻤﺔ ‏»
‘‘চারটি জিনিস যখন তোমার মধ্যে পাওয়া যাবে তখন দুনিয়ার অন্য
সব কিছু না হলেও কিছু যায় আসে না। তা হলো, আমানতের সংরক্ষণ,
সত্য কথা বলা, সুন্দর চরিত্র, হালাল উপার্জনে খাদ্যগ্রহণ’’[17]
3.2. হালাল উপার্জনের সম্ভাব্য কিছু মাধ্যম
উপার্জন হল মানুষের সম্পদ লাভের প্রক্রিয়া। ইসলাম নির্দেশিত
পথে মানুষ যে উপার্জন করে সেটিকে আমরা হালাল উপার্জন বলবো।
পৃথিবীতে নানা উৎসে সম্পদরাজিকে আল্লাহ ছড়িয়ে রেখেছেন।
মানুষকে অর্জন করতে হয় এই অর্জন প্রক্রিয়ায় নানাবিধ মাধ্যম।
ইসলাম হালাল উপার্জন করার জন্য কী কী মাধ্যম হতে পারে তার
স্পষ্ট বর্ণনা দিয়েছে। মাধ্যমগুলো হলো কৃষি, শিল্প, ব্যবসা ও
চাকুরি । এ মাধ্যমগুলোকে কীভাবে কাজে লাগানো যাবে তার জন্য
সুনির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে।
ক. কৃষি
সৃষ্টিকূলের খাদ্যের উৎস কৃষি। মহান রাব্বুল আলামীন মানুষের কৃষি
কাজের সুবিধার্থে পৃথিবীর মাটি ও ভূমিকে উৎপাদন ও ফসল
ফলানোর উপাযোগী বানিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿ ﻓَﻠۡﻴَﻨﻈُﺮِ ﭐﻟۡﺈِﻧﺴَٰﻦُ ﺇِﻟَﻰٰ ﻃَﻌَﺎﻣِﻪِۦٓ ٢٤ ﺃَﻧَّﺎ ﺻَﺒَﺒۡﻨَﺎ ﭐﻟۡﻤَﺎٓﺀَ ﺻَﺒّٗﺎ ٢٥ ﺛُﻢَّ ﺷَﻘَﻘۡﻨَﺎ ﭐﻟۡﺄَﺭۡﺽَ ﺷَﻘّٗﺎ ٢٦
ﻓَﺄَﻧۢﺒَﺘۡﻨَﺎ ﻓِﻴﻬَﺎ ﺣَﺒّٗﺎ ٢٧ ﻭَﻋِﻨَﺒٗﺎ ﻭَﻗَﻀۡﺒٗﺎ ٢٨ ﻭَﺯَﻳۡﺘُﻮﻧٗﺎ ﻭَﻧَﺨۡﻠٗﺎ ٢٩ ﻭَﺣَﺪَﺍٓﺋِﻖَ ﻏُﻠۡﺒٗﺎ ٣٠ ﻭَﻓَٰﻜِﻬَﺔٗ ﻭَﺃَﺑّٗﺎ ٣١
ﻣَّﺘَٰﻌٗﺎ ﻟَّﻜُﻢۡ ﻭَﻟِﺄَﻧۡﻌَٰﻤِﻜُﻢۡ ٣٢ ﴾ ‏[ ﻋﺒﺲ : ٢٤، ٣٢‏]
‘‘মানুষের কর্তব্য তার খাদ্যের প্রতি দৃষ্টি দেয়া-চিন্তা করা। আমিই
বৃষ্টি বর্ষণ করি, পরে জমি বিস্ময়করভাবে দীর্ণ করি। আর তাতে শস্য,
আঙ্গুর, শাক-সবাজি, তরি-তরকারি, যয়তুন, খেজুর, বিশিষ্ট
উদ্যানসমূহ, ফল এবং গবাদি-খাদ্য উৎপাদন করি, তোমাদের ও
তোমাদের পশুর ভোগের জন্য’’।[18]
আলো-বাতাস, পাহাড়-পর্বত, বন-জঙ্গল, নদী-নালা, সাগর-মহাসাগর,
সমভূমি-মরুভূমি সর্বত্র মহান আল্লাহ তাঁর সৃষ্টজীবের জীবিকার
অসীম উপকরণ রেখে দিয়েছেন- যার অংশ বিশেষও কিয়ামত পর্যন্ত
নিঃশেষিত হবে না। আলকুরআনের বিভিন্ন আয়াতে আল্লাহ
তা‘আলা তার সহজসাধ্যতার উপায়-উপকরণের দিকে মানুষের দৃষ্টি
আকর্ষণ করেছেন, যেন মানুষ তা আহরণ করে জীবিকা নির্বাহ করতে
পারে। আর এ পৃথিবীতে বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্নভাবে ছড়িয়ে-
ছিটিয়ে থাকা আল্লাহ তা‘আলার এ নিয়ামাত যে ব্যক্তি বা জাতি
নিয়মিত ও পরিমিতভাবে আহরণ করতে পারে, সে ব্যক্তি বা জাতি
তো সমৃদ্ধশালী হবেই।
খ. শিল্প
মানুষের জীবন যাপনের চাহিদা মেটানোর জন্য কৃষি যথেষ্ট নয়।
প্রয়োজন শিল্পোন্নয়ন। অনেক কৃষিজাত দ্রব্য শিল্পের মাধ্যমে
ব্যবহার উপযোগী না করলে তা থেকে মানুষ উপকার লাভ করে না।
ইসলাম কৃষি কাজের উৎসাহ দিয়েছে। তবে সকলে এ কাজে মগ্ন থাকা
থাকতে হবে এমনটি নয়। কেননা অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জাতীয় বিপদ-
আপদের মোকাবেলা কেবল মাত্র কৃষি দ্বারা সম্ভব নয়। এ জন্য কৃষি
কাজের সাথে সাথে শিল্প পেশার কাজ করাও জরুরী। এ আকাশ-
বাতাস, বন-জঙ্গল, পাহাড়-পর্বত, সাগর-মহাসাগর, মাটি-বালি ও তার
তলদেশে মহান আল্লাহ তা‘আলা যে সম্পদ সৃষ্টি করে রেখেছেন, তার
সদ্ব্যবহারের জন্য শিল্পোন্নয়ন জরুরী। শিল্পক্ষেত্রে বিশেষ সমৃদ্ধি
ছাড়া জাতীয় আয়বৃদ্ধি করা যায় না। শিল্পকর্মের প্রতি পবিত্র
কুরআনে ইঙ্গিত রয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿ ﻭَﻋَﻠَّﻤۡﻨَٰﻪُ ﺻَﻨۡﻌَﺔَ ﻟَﺒُﻮﺱٖ ﻟَّﻜُﻢۡ ﻟِﺘُﺤۡﺼِﻨَﻜُﻢ ﻣِّﻦۢ ﺑَﺄۡﺳِﻜُﻢۡۖ ﻓَﻬَﻞۡ ﺃَﻧﺘُﻢۡ ﺷَٰﻜِﺮُﻭﻥَ ٨٠ ﴾ ‏[ ﺍﻻﻧﺒﻴﺎﺀ : ٨٠‏]
‘‘আর আমরা তাকে বর্ম তৈরি করার শিল্পবিদ্যা শিক্ষা দিয়েছিলাম
যেন তা যুদ্ধে তোমাদের প্রতি রক্ষা করতে পারে তাহলে তোমরা কি
শোকর আদায় করবে।’’ [19] সোলাইমান (আ.)-এর উঁচু উঁচু প্রাসাদ, বড়
বড় পানি সঞ্চয় পাত্র এবং নূহ (আ.) এর নৌকা তৈরি বর্ণনা পবিত্র
কুরআনে উদ্ধৃত হয়েছে। তাছাড়া অধিকাংশ নবীই শিল্পকাজে জড়িত
ছিলেন। যাকারিয়্যাহ আলাইহিস সালাম ছিলেন কাঠমিস্ত্রি তাও
আমরা হাদীস থেকে জানতে পারি।
গ. ব্যবসা
ব্যবসা-বাণিজ্য একটি সম্মানজনক পেশা। জীবিকা অর্জনের এটি
একটি অন্যতম উপায়। যাদের উপর আল্লাহ তা‘আলার অনুগ্রহ রয়েছে
তারা এই পেশা অবলম্বন করে। যে জনপদের উপর আল্লাহ তা‘আলার
রহমত রয়েছে যে জনপদে ব্যবসা-কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। আল-
কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿ﻭَﺃَﺣَﻞَّ ﭐﻟﻠَّﻪُ ﭐﻟۡﺒَﻴۡﻊَ ﻭَﺣَﺮَّﻡَ ﭐﻟﺮِّﺑَﻮٰﺍْۚ ﴾ ‏[ﺍﻟﺒﻘﺮﺓ : ٢٧٥‏]
‍‍‘‘এবং আল্লাহ বেচা-কেনা হালাল করেছেন এবং সুদ হারাম
করেছেন।’’ [20]
ব্যবসায়ীরা সাধারণ উদ্বৃত্ত অঞ্চলের সামগ্রী ঘাটতি অঞ্চলে
পৌঁছিয়ে দিয়ে উদ্বৃত্ত অঞ্চলের অপচয় রোধ করে আর ঘাটতি
অঞ্চলের দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধ করে মানব সমাজের সে সেবা করছে তা
সৎকাজের অন্তর্ভুক্ত। এজন্যই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম সহ অনেক নবী-রাসূল, তাছাড়া অনেক সাহাবী যেমন আবু
বকর, উমার, উসমান, আবদুর রহমান ইবন আউফ রাদিয়াল্লাহু আনহুম
ব্যবসা-বাণিজ্য করেছেন।
ঘ. চাকুরি
জীবিকা অর্জনের আরেকটি অন্যতম উপায় হচ্ছে চাকরি। চাকরির
মাধ্যমে জীবিকা অর্জন করা ইসলামী আইনে বৈধ। তবে তাকে
দায়িত্ব পালনে সম্পূর্ণ সক্ষম হতে হবে। ইসলামে চাকরি লাভের
অন্যতম শর্ত হচ্ছে যোগ্যতা অর্জন। যথাযথ যোগ্যতা অর্জন ছাড়া
কোনো পদের জন্য আবেদন করা ঠিক নয়। হারাম কাজ জনগণের
ক্ষতিকারক কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা ইসলাম অনুমোদন করে
না। এক্ষেত্রে আবু যার রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত একটি
হাদীসে এসেছে যে,
‏«ﻗُﻠْﺖُ ﻳَﺎ ﺭَﺳُﻮﻝَ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﺃَﻟَﺎ ﺗَﺴْﺘَﻌْﻤِﻠُﻨِﻲ ﻗَﺎﻝَ ﻓَﻀَﺮَﺏَ ﺑِﻴَﺪِﻩِ ﻋَﻠَﻰ ﻣَﻨْﻜِﺒِﻲ ﺛُﻢَّ ﻗَﺎﻝَ ﻳَﺎ ﺃَﺑَﺎ ﺫَﺭٍّ ﺇِﻧَّﻚَ
ﺿَﻌِﻴﻒٌ ﻭَﺇِﻧَّﻬَﺎ ﺃَﻣَﺎﻧَﺔُ ﻭَﺇِﻧَّﻬَﺎ ﻳَﻮْﻡَ ﺍﻟْﻘِﻴَﺎﻣَﺔِ ﺧِﺰْﻱٌ ﻭَﻧَﺪَﺍﻣَﺔٌ ﺇِﻟَّﺎ ﻣَﻦْ ﺃَﺧَﺬَﻫَﺎ ﺑِﺤَﻘِّﻬَﺎ ﻭَﺃَﺩَّﻯ ﺍﻟَّﺬِﻱ ﻋَﻠَﻴْﻪِ
ﻓِﻴﻬَﺎ‏»
‘‘আমি বললাম হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি আমাকে কোনো
দায়িত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দিবেন না ! একথা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর হাত আমার কাঁধের উপর রেখে বললেন,
হে আবু যার! তুমি বড় দুর্বল ব্যক্তি। আর এ পদ হচ্ছে কঠিন আমানতের
ব্যাপার। কিয়ামতের দিন তা-ই হবে লজ্জা ও লাঞ্ছনার কারণ, তবে
যে লোক এ দায়িত্বপূর্ণ যোগ্যতার সাথে সে দায়িত্ব গহণ করে এবং
দক্ষতা ও সততার সাথে যথাযথভাবে তা পালন করবে তার বেলায় নয়।
[21]
চাকরির ক্ষেত্রে ইসলামী আইন হচ্ছে উপযুক্ততা ও পরোপকারিতা।
চাকুরিজীবিগণ স্ব স্ব দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের মাধ্যমে
জীবিকা অর্জন করবে এবং পরোপকারের মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলার
সন্তুষ্টি অর্জন করবে।
3.3. হালাল উপার্জনের মূলনীতি
ইসলামে উপার্জনের ক্ষেত্রে অনুসরণীয় মূলনীতি রয়েছে। এ
নীতিগুলো অনুসরণ না করলে উপার্জন হালাল হবে না। যা নিম্নে
সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো :
ক. উপার্জেয় বস্তুটি হালাল হওয়া
একজন ব্যক্তি যা উপার্জন করবে সে উপার্জেয় বস্তুটি অবশ্যই
হালাল হতে হবে। আর ইসলাম কল্যাণকর সকল বস্তুকে মানবজাতির
জন্য হালাল করেছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿ ﻳَٰٓﺄَﻳُّﻬَﺎ ﭐﻟﻨَّﺎﺱُ ﻛُﻠُﻮﺍْ ﻣِﻤَّﺎ ﻓِﻲ ﭐﻟۡﺄَﺭۡﺽِ ﺣَﻠَٰﻠٗﺎ ﻃَﻴِّﺒٗﺎ ﻭَﻟَﺎ ﺗَﺘَّﺒِﻌُﻮﺍْ ﺧُﻄُﻮَٰﺕِ ﭐﻟﺸَّﻴۡﻄَٰﻦِۚ ﺇِﻧَّﻪُۥ ﻟَﻜُﻢۡ ﻋَﺪُﻭّٞ
ﻣُّﺒِﻴﻦٌ ١٦٨ ﴾ ‏[ﺍﻟﺒﻘﺮﺓ : ١٦٨‏]
‘‘হে মানুষ পৃথিবীতে হালাল ও তাইয়্যিব যা রয়েছে তা থেকে আহার
কর। আর শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না, নিঃসন্দেহে সে
তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।’’ [22]
খ. উপার্জেয় বস্তুটি পবিত্র (তাইয়্যিব) হওয়া
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿ ﻭَﻛُﻠُﻮﺍْ ﻣِﻤَّﺎ ﺭَﺯَﻗَﻜُﻢُ ﭐﻟﻠَّﻪُ ﺣَﻠَٰﻠٗﺎ ﻃَﻴِّﺒٗﺎۚ ﻭَﭐﺗَّﻘُﻮﺍْ ﭐﻟﻠَّﻪَ ﭐﻟَّﺬِﻱٓ ﺃَﻧﺘُﻢ ﺑِﻪِۦ ﻣُﺆۡﻣِﻨُﻮﻥَ ٨٨ ﴾ ‏[ ﺍﻟﻤﺎﺋﺪﺓ:
٨٨‏]
‘‘আর আহার কর আল্লাহ যা তোমাদের রিয্ক দিয়েছেন তা থেকে
হালাল, পবিত্র বস্তু। আর তাকওয়া অবলম্বন কর আল্লাহর যার প্রতি
তোমরা মুমিন।’’ [23]
সুতরাং শুধুমাত্র হালাল হলেই চলবে না; বরং তা অবশ্যই তাইয়্যিব
(পবিত্র ও উত্তম) হতে হবে। এখানে তাইয়্যিব বলতে ভেজালমুক্ত
স্বাস্থ্যসম্মত ইত্যাদি উদ্দেশ্য। এমন উপায় অবলম্বন করতে হবে যা
মূলগতভাবেই নির্ভেজাল, খাটি ও পবিত্র। অবশ্য অধিকাংশ
মুফাসসিরগণ আয়াতে হালাল শব্দ দ্বারা ‘মূলগত বৈধতা’ এবং
‘তাইয়্যিব’ দ্বারা পদ্ধতিগত বৈধতার অর্থ গ্রহণ করেছেন এবং এ
দু’শব্দ দিয়ে দু’টি মূলনীতির প্রতি ইঙ্গিত করেছেন।
গ. উপার্জনের ক্ষেত্রে মাধ্যমটি বৈধ হওয়া
উপার্জনের ক্ষেত্রে গ্রহণীয় উপায় ও মাধ্যমটি অবশ্যই বৈধ পন্থায়
হতে হবে। কেননা যাবতীয় অবৈধ উপায় ও পন্থায় অর্থসম্পদ
উপার্জন করতে ইসলাম নিষেধ করেছে। পবিত্র কুরআনের একাধিক
আয়াতের মাধ্যমে এ বিষয়ে মুমিনগণকে সর্তক করা হয়েছে। মহান
আল্লাহ বলেন,
﴿ ﻳَٰٓﺄَﻳُّﻬَﺎ ﭐﻟَّﺬِﻳﻦَ ﺀَﺍﻣَﻨُﻮﺍْ ﻟَﺎ ﺗَﺄۡﻛُﻠُﻮٓﺍْ ﺃَﻣۡﻮَٰﻟَﻜُﻢ ﺑَﻴۡﻨَﻜُﻢ ﺑِﭑﻟۡﺒَٰﻄِﻞِ ﺇِﻟَّﺎٓ ﺃَﻥ ﺗَﻜُﻮﻥَ ﺗِﺠَٰﺮَﺓً ﻋَﻦ ﺗَﺮَﺍﺽٖ ﻣِّﻨﻜُﻢۡۚ
﴾ ‏[ ﺍﻟﻨﺴﺎﺀ: ٢٩ ‏]
‘‘হে যারা ঈমান এনেছ, তোমরা পরস্পরের মধ্যে তোমাদের ধন-সম্পদ
অন্যায়ভাবে খেয়ো না, তবে পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যবসার মাধ্যমে
হলে ভিন্ন কথা।’’ [24]
ঘ. উপার্জনে কম বা বেশি হওয়াকে পরীক্ষা হিসেবে মনে করা
বেশি বা কম উপার্জন করার মধ্যে আল্লাহ পরীক্ষা করে থাকেন। এ
বিষয়ে কুরআনে বলা হয়েছে,
﴿ ﻓَﺄَﻣَّﺎ ﭐﻟۡﺈِﻧﺴَٰﻦُ ﺇِﺫَﺍ ﻣَﺎ ﭐﺑۡﺘَﻠَﻯٰﻪُ ﺭَﺑُّﻪُۥ ﻓَﺄَﻛۡﺮَﻣَﻪُۥ ﻭَﻧَﻌَّﻤَﻪُۥ ﻓَﻴَﻘُﻮﻝُ ﺭَﺑِّﻲٓ ﺃَﻛۡﺮَﻣَﻦِ ١٥ ﻭَﺃَﻣَّﺎٓ ﺇِﺫَﺍ ﻣَﺎ
ﭐﺑۡﺘَﻠَﻯٰﻪُ ﻓَﻘَﺪَﺭَ ﻋَﻠَﻴۡﻪِ ﺭِﺯۡﻗَﻪُۥ ﻓَﻴَﻘُﻮﻝُ ﺭَﺑِّﻲٓ ﺃَﻫَٰﻨَﻦِ ١٦ ﴾ ‏[ ﺍﻟﻔﺠﺮ : ١٥، ١٦‏]
‘‘আর মানুষ তো এমন যে, যখন তার রব তাকে পরীক্ষা করেন, অতঃপর
তাকে সম্মান দান করেন এবং অনুগ্রহ প্রদান করেন, তখন সে বলে,
‘আমার রব আমাকে সম্মানিত করেছেন। আর যখন তিনি তাকে পরীক্ষা
করেন এবং তার উপর তার রিয্ককে সঙ্কুচিত করে দেন, তখন সে বলে,
‘আমার রব আমাকে অপমানিত করেছেন’।’’ [25]
ঙ. উপার্জন আল্লাহর বিধান পালনে প্রতিবন্ধক হতে পারবে না
অনেক সময় উপার্জন করতে করতে আল্লাহর কথা স্মরণ থাকে না।
আল্লাহর ইবাদাতের কথা ভুলে যায়। এটা মোটেই গ্রহণযোগ্য হবে
না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿ ﻳَٰٓﺄَﻳُّﻬَﺎ ﭐﻟَّﺬِﻳﻦَ ﺀَﺍﻣَﻨُﻮﺍْ ﻟَﺎ ﺗُﻠۡﻬِﻜُﻢۡ ﺃَﻣۡﻮَٰﻟُﻜُﻢۡ ﻭَﻟَﺎٓ ﺃَﻭۡﻟَٰﺪُﻛُﻢۡ ﻋَﻦ ﺫِﻛۡﺮِ ﭐﻟﻠَّﻪِۚ ﻭَﻣَﻦ ﻳَﻔۡﻌَﻞۡ ﺫَٰﻟِﻚَ ﻓَﺄُﻭْﻟَٰٓﺌِﻚَ ﻫُﻢُ
ﭐﻟۡﺨَٰﺴِﺮُﻭﻥَ ٩ ﴾ ‏[ ﺍﻟﻤﻨﺎﻓﻘﻮﻥ: ٩‏]
‘‘হে মুমিনগণ, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন
তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ থেকে উদাসীন না করে। আর যারা এরূপ
করে তারাই তো ক্ষতিগ্রস্ত।’’ [26]
চ. কেবল সম্পদ অর্জনই আল্লাহর নৈকট্য লাভের উপায় নয়
কেবল সম্পদ অর্জন আল্লাহর নৈকট্য লাভে বাঁধাও হতে পারে, এ
প্রসঙ্গে কুরআনে বলা হয়েছে,
﴿ ﻭَﻣَﺎٓ ﺃَﻣۡﻮَٰﻟُﻜُﻢۡ ﻭَﻟَﺎٓ ﺃَﻭۡﻟَٰﺪُﻛُﻢ ﺑِﭑﻟَّﺘِﻲ ﺗُﻘَﺮِّﺑُﻜُﻢۡ ﻋِﻨﺪَﻧَﺎ ﺯُﻟۡﻔَﻰٰٓ ﺇِﻟَّﺎ ﻣَﻦۡ ﺀَﺍﻣَﻦَ ﻭَﻋَﻤِﻞَ ﺻَٰﻠِﺤٗﺎ ﻓَﺄُﻭْﻟَٰٓﺌِﻚَ ﻟَﻬُﻢۡ
ﺟَﺰَﺍٓﺀُ ﭐﻟﻀِّﻌۡﻒِ ﺑِﻤَﺎ ﻋَﻤِﻠُﻮﺍْ ﻭَﻫُﻢۡ ﻓِﻲ ﭐﻟۡﻐُﺮُﻓَٰﺖِ ﺀَﺍﻣِﻨُﻮﻥَ ٣٧ ﴾ ‏[ ﺳﺒﺎ : ٣٧‏]
‘‘আর তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি এমন বস্তু নয় যা
তোমাদেরকে আমার নিকটবর্তী করে দেবে। তবে যারা ঈমান আনে ও
নেক আমল করে, তারাই তাদের আমলের বিনিময়ে পাবে বহুগুণ
প্রতিদান। আর তারা (জান্নাতের) সুউচ্চ প্রাসাদে নিরাপদে
থাকবে।’’ [27]
ছ. রিযক দেরিতে আসছে বলে অবৈধ পন্থা অবলম্বন না করা
রিযক দেরিতে আসছে বলে অবৈধ পন্থা অবলম্বন করা যাবে না।
জাবের রাদি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম বলেন,
‏« ﻻ ﺗَﺴْﺘَﺒْﻄِﺌُﻮﺍ ﺍﻟﺮِّﺯْﻕَ، ﻓَﺈِﻧَّﻪُ ﻟَﻦْ ﻳَﻤُﻮﺕَ ﺍﻟْﻌَﺒْﺪُ ﺣَﺘَّﻰ ﻳَﺒْﻠُﻐَﻪُ ﺁﺧِﺮُ ﺭِﺯْﻕٍ ﻫُﻮَ ﻟَﻪُ، ﻓَﺄَﺟْﻤِﻠُﻮﺍ ﻓِﻲ ﺍﻟﻄَّﻠَﺐِ
ﺃَﺧَﺬِ ﺍﻟْﺤَﻼﻝِ، ﻭَﺗَﺮَﻙِ ﺍﻟْﺤَﺮَﺍﻡِ ‏»
‘রিযক দেরিতে আসছে বলে অবৈধ পন্থা অবলম্বন করো না। কেননা
কোনো বান্দা ততক্ষণ পর্যন্ত মারা যায় না যতক্ষণ না তার
নির্ধারিত শেষ রিযক তার কাছে পৌঁছে যায়। অতঃপর তোমরা হালাল
রিযক সুন্দরভাবে তালাশ করো। হালাল গ্রহণ কর, আর হারাম থেকে
বিরত হও।’[28]
3.4. হালাল উপার্জনে অর্জনীয়
ক. সততা
উপার্জন হালাল করার ক্ষেত্রে সততা থাকতে হবে। উপার্জেয় বস্তু
হালাল এবং পদ্ধতিগতভাবে হালাল হলেও সততা না থাকলে
উপার্জন হালাল হবে না। আর সততা অর্জন করার মাধ্যমে
জান্নাতে যাওয়ার বিরাট সুযোগ রয়েছে। হাদীসে এসেছে,
ﻋَﻦْ ﺃَﺑِﻲ ﺳَﻌِﻴﺪٍ ، ﻋَﻦْ ﺭَﺳُﻮﻝِ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﺻَﻠَّﻰ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻭَﺳَﻠَّﻢَ ، ﻗَﺎﻝَ : ﺍﻟﺘَّﺎﺟِﺮُ ﺍﻟﺼَّﺪُﻭﻕُ ﺍﻷَﻣِﻴﻦُ ﻣَﻊَ
ﺍﻟﻨَّﺒِﻴِّﻴﻦَ ﻭَﺍﻟﺼِّﺪِّﻳﻘِﻴﻦَ ﻭَﺍﻟﺸُّﻬَﺪَﺍﺀِ
‘‘আবু সাঈদ খুদরী রাদি আল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “সৎ ও আমানতদার
ব্যবসায়ী (কিয়ামতের দিন) নবীগণ, সিদ্দিকীন ও শহীদদের সাথে
থাকবে।”[29]
খ. আমানতদারিতা
আমানতদারিতা এমন একটি গুণ যা হালাল উপার্জন করার জন্য
অপরিহার্য। আমানতদারিতা না থাকলে উপার্জন হালাল হবে না ।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿ ﻓَﺈِﻥۡ ﺃَﻣِﻦَ ﺑَﻌۡﻀُﻜُﻢ ﺑَﻌۡﻀٗﺎ ﻓَﻠۡﻴُﺆَﺩِّ ﭐﻟَّﺬِﻱ ﭐﺅۡﺗُﻤِﻦَ ﺃَﻣَٰﻨَﺘَﻪُۥ ﻭَﻟۡﻴَﺘَّﻖِ ﭐﻟﻠَّﻪَ ﺭَﺑَّﻪُۥۗ ﴾ ‏[ﺍﻟﺒﻘﺮﺓ : ٢٨٣‏]
‘‘আর যদি তোমরা একে অপরকে বিশ্বস্ত মনে কর, তবে যাকে বিশ্বস্ত
মনে করা হয়, সে যেন স্বীয় আমানত আদায় করে এবং নিজ রব
আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করে।’’ [30]
গ. ওয়াদা পালন করা
চাকরি বা ব্যবসায় যেসব ওয়াদা করা হবে তা অবশ্যই পালন করতে
হবে। ওয়াদা পালন করে হালাল উপার্জন করার পাশাপাশি আল্লাহর
ভালবাসাও পাওয়া যায়। আল-কুরআনে আল্লাহ বলেন,
﴿ ﺑَﻠَﻰٰۚ ﻣَﻦۡ ﺃَﻭۡﻓَﻰٰ ﺑِﻌَﻬۡﺪِﻩِۦ ﻭَﭐﺗَّﻘَﻰٰ ﻓَﺈِﻥَّ ﭐﻟﻠَّﻪَ ﻳُﺤِﺐُّ ﭐﻟۡﻤُﺘَّﻘِﻴﻦَ ٧٦ ﴾ ‏[ ﺍﻝ ﻋﻤﺮﺍﻥ : ٧٦‏]
‘‘হ্যাঁ, অবশ্যই যে নিজ প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করে এবং তাকওয়া অবলম্বন
করে, তবে নিশ্চয় আল্লাহ মুত্তাকীদেরকে ভালবাসেন।’’ [31]
তাছাড়া ওয়াদাপূরণ জান্নাতে যাওয়ার কারণ হবে। উবাদা ইবন
সাবিত রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
‏« ﺍﺿْﻤَﻨُﻮﺍ ﻟِﻲ ﺳِﺘًّﺎ ﺃَﺿْﻤَﻦْ ﻟَﻜُﻢُ ﺍﻟْﺠَﻨَّﺔَ ﺍﺻْﺪُﻗُﻮﺍ ﺇِﺫَﺍ ﺣَﺪَّﺛْﺘُﻢْ ﻭَﺃَﻭْﻓُﻮﺍ ﺇِﺫَﺍ ﻭَﻋَﺪْﺗُﻢْ ﻭَﺃَﺩُّﻭﺍ ﺇِﺫَﺍ ﺍﺋْﺘُﻤِﻨْﺘُﻢْ
ﻭَﺍﺣْﻔَﻈُﻮﺍ ﻓُﺮُﻭﺟَﻜُﻢْ ﻭَﻏُﻀُّﻮﺍ ﺃﺑﺼﺎﺭﻛﻢ ﻭﻛﻔﻮﺍ ﺃﻳﺪﻳﻜﻢ ‏»
‘তোমরা আমাকে ছয়টি বিষয়ের নিশ্চয়তা দাও, আমি তোমদেরকে
জান্নাতে যাওয়ার যামীন হব, যখন কথা বলবে সত্য বলবে, যখন
ওয়াদা করবে তা পূরণ করবে, যখন আমানত গ্রহণ করবে তখন তা
আদায় করবে, তোমাদের লজ্জাস্থানের হেফাযত করবে, তোমাদের
চক্ষুগুলো নীচু করে রাখবে এবং হাতগুলো নিয়ন্ত্রনে রাখবে’।[32]
ঘ. আন্তরিকতা
উপার্জন হালাল করার জন্য উক্ত কাজে আন্তরিক হতে হবে। কথা ও
কাজের গরমিল পাওয়া গেলে হালাল উপার্জন থেকে বঞ্চিত থাকতে
হবে। আন্তরিকতার ঘাটতি মুনাফিকের লক্ষণ। আল্লাহ তা‘আলা
বলেন,
﴿ ﻳَﻘُﻮﻟُﻮﻥَ ﺑِﺄَﻓۡﻮَٰﻫِﻬِﻢ ﻣَّﺎ ﻟَﻴۡﺲَ ﻓِﻲ ﻗُﻠُﻮﺑِﻬِﻢۡۚ ﴾ ‏[ ﺍﻝ ﻋﻤﺮﺍﻥ : ١٦٧‏]
‘‘তারা তাদের মুখে বলে, যা তাদের অন্তরসমূহে নেই।’’ [33]
ঙ. স্বচ্ছতা
উপার্জন হালাল করার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা থাকতে হবে, কোনো
গোজামিল বা অস্পষ্টতা থাকতে পারবে না । আল্লাহ তা‘আলা
বলেন,
﴿ ﻳَٰٓﺄَﻳُّﻬَﺎ ﭐﻟَّﺬِﻳﻦَ ﺀَﺍﻣَﻨُﻮﺍْ ﭐﺗَّﻘُﻮﺍْ ﭐﻟﻠَّﻪَ ﻭَﻗُﻮﻟُﻮﺍْ ﻗَﻮۡﻟٗﺎ ﺳَﺪِﻳﺪٗﺍ ٧٠ ﴾ ‏[ ﺍﻻﺣﺰﺍﺏ: ٧٠‏]
‘‘হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সঠিক কথা
বল।’’ [34]
আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন,
﴿ ﻗُﻞۡ ﺇِﻥ ﺗُﺨۡﻔُﻮﺍْ ﻣَﺎ ﻓِﻲ ﺻُﺪُﻭﺭِﻛُﻢۡ ﺃَﻭۡ ﺗُﺒۡﺪُﻭﻩُ ﻳَﻌۡﻠَﻤۡﻪُ ﭐﻟﻠَّﻪُۗ ﻭَﻳَﻌۡﻠَﻢُ ﻣَﺎ ﻓِﻲ ﭐﻟﺴَّﻤَٰﻮَٰﺕِ ﻭَﻣَﺎ ﻓِﻲ ﭐﻟۡﺄَﺭۡﺽِۗ
ﻭَﭐﻟﻠَّﻪُ ﻋَﻠَﻰٰ ﻛُﻞِّ ﺷَﻲۡﺀٖ ﻗَﺪِﻳﺮٞ ٢٩ ﴾ ‏[ ﺍﻝ ﻋﻤﺮﺍﻥ : ٢٩‏]
‘‘বল, ‘তোমরা যদি তোমাদের অন্তরসমূহে যা আছে তা গোপন কর
অথবা প্রকাশ কর, আল্লাহ তা জানেন। আর আসমানসমূহে যা কিছু
আছে ও যমীনে যা আছে, তাও তিনি জানেন। আল্লাহ সব কিছুর উপর
ক্ষমতাবান।’’ [35]
চ. শৃঙ্খলা
ব্যক্তির মধ্যে শৃঙ্খলাবোধ থাকতে হবে। এমন বিধি-বিধান যা কুর’আন
সুন্নাহ বিরোধী নয় তা মেনে চলতে হবে। কুরআনে বলা হয়েছে,
﴿ ﻳَٰٓﺄَﻳُّﻬَﺎ ﭐﻟَّﺬِﻳﻦَ ﺀَﺍﻣَﻨُﻮٓﺍْ ﺃَﻃِﻴﻌُﻮﺍْ ﭐﻟﻠَّﻪَ ﻭَﺃَﻃِﻴﻌُﻮﺍْ ﭐﻟﺮَّﺳُﻮﻝَ ﻭَﺃُﻭْﻟِﻲ ﭐﻟۡﺄَﻣۡﺮِ ﻣِﻨﻜُﻢۡۖ﴾ ‏[ﺍﻟﻨﺴﺎﺀ : ٥٩ ‏]
‘‘হে মুমিনগণ, তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহর ও আনুগত্য কর রাসূলের
এবং তোমাদের মধ্য থেকে কর্তৃত্বের অধিকারীদের।’’ [36]
ছ. ইলম অর্জন করা
যেহেতু ইসলামী অর্থ ব্যবস্থা চালু নেই, সেজন্য ব্যক্তিকে হালাল
উপার্জন করার জন্য ইলম অর্জন করতে হবে। কারণ তাকে জানতে
হবে কোনটি হারাম আর কোনটি হালাল। কুরআনে বলা হয়েছে,
﴿ ﻗُﻞۡ ﻣَﻦۡ ﺣَﺮَّﻡَ ﺯِﻳﻨَﺔَ ﭐﻟﻠَّﻪِ ﭐﻟَّﺘِﻲٓ ﺃَﺧۡﺮَﺝَ ﻟِﻌِﺒَﺎﺩِﻩِۦ ﻭَﭐﻟﻄَّﻴِّﺒَٰﺖِ ﻣِﻦَ ﭐﻟﺮِّﺯۡﻕِۚ﴾ ‏[ﺍﻻﻋﺮﺍﻑ : ٣٢ ‏]
‘‘ বল, ‘কে হারাম করেছে আল্লাহর সৌন্দর্যোপকরণ, যা তিনি তাঁর
বান্দাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন এবং পবিত্র রিয্ক?’’ [37]
· হারাম উপার্জন
হারাম উপার্জন সম্পর্কে জানা না থাকলে উপার্জনকে শতভাগ
হালাল করা যাবে না। সেজন্য কোনটি হারাম উপার্জন তা সম্পর্কেও
জানতে হবে । এ বিষয়ে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿ﻭَﻗَﺪۡ ﻓَﺼَّﻞَ ﻟَﻜُﻢ ﻣَّﺎ ﺣَﺮَّﻡَ ﻋَﻠَﻴۡﻜُﻢۡ ﴾ ‏[ ﺍﻻﻧﻌﺎﻡ : ١١٩‏]
‘‘ অথচ তিনি তোমাদের জন্য বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন, যা
তোমাদের উপর হারাম করেছেন।’’ [38]
হারাম উপার্জন দুইভাবে হতে পারে: একটি বস্তুগত হারাম অপরটি
হলো পদ্ধতিগত হারাম।
১. বস্তুগত হারাম
কিছু কিছু বস্তু রয়েছে যা মূলগতভাবেই হারাম। এগুলোকে কোনভাবেই
হালাল করার সুযোগ নেই। যেমন: মদ, চুরি করা, অন্যায়ভাবে কাউকে
হত্যা করা, শুকরের গোশত, মৃত প্রাণির গোশত ইত্যাদি।
২. পদ্ধতিগত হারাম
কিছু কিছু বস্তু রয়েছে যা মূলগত হারাম নয় পদ্ধতির কারণে হারাম।
যেমন, সুদ, ঘুষ বা উপরি আয় বা বখশিস বা Invisible cost বা speed
money, জুয়া, লটারী, ধোঁকা, প্রতারণা, মওজুদদারী, কালোবাজারী,
মুনাফাখোরী, ফটকাবাজারী, চোরাচালান, চটকদার ভুয়

No comments

Powered by Blogger.