Header Ads

বিদআত এর অর্থ ও তার কু প্রবাত



বিদ’আতের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে “নযীরহীনভাবে কিছু নব
আবিস্কার করা ।” যেমন আল্লাহ তা’আলা বলেছেন : “তিনি
(নযীরবিহীন) আসমান ও যমীনের স্রষ্টা” সূরা বাকারাহ /১১৭
পারিভাষিক অর্থে বিদ’আত বলা হয় : “ধর্মের মধ্যে যে নবাবিস্কৃত
ইবাদাত , বিশ্বাস ও কথার সমর্থনে কুরআন ও সুন্নাহের মধ্যে কোন
দলীল মিলে না অথচ তা ছাওয়াবের উদ্দেশ্যে করা হয় তাকেই
বিদ’আত বলা হয় ।”
ব্যক্তি , সমাজ , ধর্মীয় মাসআলা মাসায়েলের উপর বিদ’আতের
কুপ্রভাব অত্যন্ত ভয়ানক । তবে বিদ’আতের স্তর রয়েছে । স্তরভেদে
বিদ’আতের ক্ষতিকর কুপ্রভাবগুলো প্রযোজ্য । একটি কথা মনে
রাখতে হবে ক্ষেত্র বিশেষে বিদ’আতকে যত ছোটই ভাবা হোক , তা
রাসূল (সাঃ) এর এ (শরী’আতের মাঝে প্রত্যেক নবাবিস্কারই
বিদ’আত আর প্রত্যেক বিদ’আত ভ্রষ্টতা আর প্রত্যেক ভ্রষ্টতার
পরিণাম জাহান্নাম) বাণীর আওতা হতে কোন অবস্থাতেই বের হবে
না । অতএব বিদ’আতের ভয়ানক ক্ষতিকর কুপ্রভাবগুলো আমাদের
জানা দরকার । এ করণেই নিম্নে সংক্ষেপে সেগুলো উল্লেখ করা
হলঃ
আল্লামাহ শাতেবী (রহঃ) সহ অন্যান্য ইসলামী বিশেষজ্ঞগণ
বিদ’আতের যে সব কুপ্রভাব উল্লেখ করেছেন সেগুলো নিম্নরুপঃ
১. বিদ’আতীর কোন আমল কবুল করা হবে না : রাসূল (সাঃ) বলেছেন :
“যে ব্যক্তি দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু আবিস্কার করবে বা কোন
নবাবিস্কারকারীকে আশ্রয় দিবে তার উপর আল্লাহ এবং সকল
ফেরেশতা ও মানুষের অভিশাপ……. তার ফরয ইবাদাত বা তাওবাহ ,
নফল ইবাদাত বা ফিদইয়া কবুল করা হবে না ….।” বুখারী , কিতাবুল
জিযিয়াহ , হা/৩১৮০ ।
ইমাম আওযা’ঈ বলেন কোন কোন বিশেষজ্ঞ আলেম বলেছেন :
বিদ’আতীর সালাত , সিয়াম , সাদাকাহ , জিহাদ , হাজ্জ , উমরাহ ,
কোন ফরয ইবাদাত বা তাওবাহ , নফল ইবাদাত বা ফিদইয়া
গ্রহণযোগ্য হবে না । অনুরুপ কথা হিশাম ইবনু হাস্সানও বলেছেন ।
আইউব আস-সুখতিয়ানী বলেন : বিদ’আতী তার প্রচেষ্টা যতই বৃদ্ধি
করবে আল্লাহর নিকট হতে তার দূরত্ব ততই বৃদ্ধি পাবে ।
এছাড়া যে বিদ’আতকে পছন্দ করে তার ধারনা শরীয়ত পূর্ণ নয় , অথচ
আল্লাহ তা’আলা বলেছেন : “আমি তোমাদের জন্য তোমাদের
দ্বীনকে পূর্ণ করে দিয়েছি” সূরা মায়েদা/২ । কারণ তার নিকট যদি
দ্বীন পরিপূর্ণ হয়ে যেয়েই থাকে তাহলে সে শরীয়তের মধ্যে নতুন
কিছুর প্রবেশ ঢুকাবে কেন বা তাকে অবহিত করার পরেও কেনই বা
বিদ’আতের উপর আমল করবে ।
২. বিদ’আত পরিত্যাগ না করা পর্যন্ত বিদ’আতীর কোন প্রকার
তওবাহ করার সুযোগ জুটবে না : “আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক
বিদ’আতির বিদ’আতকে পরিত্যাগ না করা পর্যন্ত তওবার পথ রুদ্ধ
করে দিয়েছেন” – সহীহ আত তারগীব ওয়াত তারহীব ১/১৩০পৃ হাদীস
নং ৫৪ ।
৩. বিদ’আতী নবী (সাঃ) এর হাওযে কাওসারের পানি পান করা হতে
বঞ্চিত হবে : আবু হাসেম হতে বর্ণিত , তিনি বলেন আমি সাহালকে
বলতে শুনেছি তিনি রাসূল (সাঃ) কে বলতে শুনেছেন , “আমি
তোমাদের পূর্বেই হাওযে কাওসারের নিকট পৌঁছে যাব । যে ব্যক্তি
সেখানে নামবে এবং তার পানি পান করবে সে আর কখনও পিপাসিত
হবে না । কতিপয় লোক আমার নিকট আসতে চাইবে , আমি তাদেরকে
চিনি আর তারাও আমাকে চেনে । অতঃপর আমার ও তাদের মধ্যে
পর্দা পড়ে যাবে । রাসূল (সাঃ) বলবেন : তারা তো আমার উম্মাতের
অন্তর্ভুক্ত । তাকে বলা হবে আপনি জানেন না আপনার পরে তারা
কি আমল করেছে । তখন যে ব্যক্তি আমার পরে (দ্বীনকে) পরিবর্তন
করেছে তাকে আমি বলবো : দূর হয়ে যা , দূর হয়ে যা” সহীহ মুসলিম
হা/৪২৪৩ ।
৪. বিদ’আতী অভিশপ্ত : কারণ রাসূল (সাঃ) বলেছেন : “যে ব্যক্তি
দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু আবিস্কার করবে বা কোন
নবাবিস্কারকারীকে আশ্রয় দিবে তার উপর আল্লাহ এবং সকল
ফেরেশতা ও মানুষের অভিশাপ ।” বুখারী , কিতাবুল জিযিয়াহ ,
হা/৩১৮০ ।
৫. বিদ’আতীর নিকট যাওয়া ও তাকে সম্মান করা ইসলামকে ধ্বংস
করার শামিল : পূর্বোল্লিখিত হাদীসটিই এ দলীল হিসেবে উল্লেখ
করা যেতে পারে । ( যদিও আল্লামাহ শাতেবী (রহঃ) একটি দূর্বল
হাদীস দ্বারা দলীল দিয়েছেন ।) কারণ বিদআতীকে আশ্রয় দিলেই
তাকে সম্মান করা হয় । আর যখন এ কারণে ইবাদাতগুলো কবুল করা হয়
না , তখন আশ্রয়দানকারী তার ইসলামকে যে ধ্বংস করে দিল তাতে
কোন সন্দেহ নেই ।
বিশিষ্ট তাবে’ঈ হাসসান ইবনু আতিয়াহ (রহঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে
তিনি বলেন : “কোন সম্প্রদায় যখন তাদের দ্বীনের মধ্যে কোন
বিদ’আত চালু করে তখন আল্লাহ তা’য়ালা তাদের থেকে অনুরুপ
একটি সুন্নাতকে উঠিয়ে নেন । অতঃপর কিয়ামাত পর্যন্ত তাদের
নিকট সুন্নাতটি আর ফিরিয়ে দেন না” । -মুকাদ্দিমা দারেমী ।
আরো এসেছে যে , “কোন ব্যক্তি ইসলামের মধ্যে কোন প্রকার
বিদ’আত চালু করলেই সে তার চেয়ে উত্তম সুন্নাতকে পরিত্যাগ
করে” । – আল ইতিসাম ১/১৫৩ ।
ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন : “প্রত্যেক বছরই
লোকেরা একটি করে বিদ’আত চালু করবে আর একটি করে সুন্নাতকে
মেরে ফেলবে । শেষ পর্যন্ত বিদ’আত জীবিত হবে আর সুন্নাতগুলো
মারা যাবে” । -আল ইতিসাম ১/১৫৩ ।
৬. আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নিকট হতে বিদ’আতীর দূরত্ব বাড়তেই
থাকবে : হাসান বছরী হতে বর্ণিত , তিনি বলেন : বিদ’আতী সালাত ,
সিয়াম ও ইবাদাতে যতই তার প্রচেষ্টা বৃদ্ধি করবে ততই আল্লাহর
নিকট হতে তার দূরত্ব বৃদ্ধি পাবে ।
আইউব আস-সুখতিয়ানী বলেন : বিদ’আতী তার প্রচেষ্টা যতই বৃদ্ধি
করবে আল্লাহর নিকট হতে তার দূরত্ব ততই বৃদ্ধি পাবে ।
রাসূল (সাঃ) হতে বর্ণিত হাদীসেও এ অর্থের ইঙ্গিত বহন করছে ।
তিনি খারেজিদের সম্পর্কে বলেছেন : “…… তারা দ্বীনের মধ্য হতে
এমনভাবে বেরিয়ে যাবে যেমনভাবে তীর ধনুক হতে বেরিয়ে যায়
।” (বুখারী , মুসলিম) ।
এ বেরিয়ে যাওয়া তাদের বিদ’আতের কারণেই । এ হাদীসের মধ্যেই
বলা হয়েছে “অথচ তাদের সালাত ও সিয়ামের তুলনায় তোমাদের
সালাত ও সিয়ামগুলোকে তোমরা তুচ্ছ মনে করবে” ।
৭. বিদ’আত ইসলামী লোকদের মাঝে দুশমনী , ঘৃণা , বিভেদ ও
বিভক্তি সৃষ্টি করে : কারণ বিদ’আত লোকদেরকে বিভক্তির দিকে
আহবান করে , কুরআন তারই প্রমাণ দিচ্ছে । আর এ থেকেই দুশমনী ও
ঘৃণার সৃষ্টি হয় । আল্লাহ তা’য়ালা বলেন : “তোমরা সেই সব
লোকদের মত হয়ো না যারা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এবং তাদের কাছে
সুস্পষ্ট প্রমাণাদি আসার পরেও মতভেদ করেছে , তাদের জন্য রয়েছে
ভয়ংকর আযাব” – সূরা আলে-ইমরান : ১০৫ ।
তিনি আরও বলেন : “নিশ্চয় এটিই আমার সোজা সরল পথ তোমরা
তারই অনুসরণ কর , তোমরা বহু পথের অনুসরণ করো না , কারণ তা
তোমাদেরকে তাঁর এক পথ হতে বিচ্ছিন্ন করে দিবে” – সূরা আন’আম :
১৫৩ ।
তিনি আরও বলেন : “নিশ্চয় যারা তাদের দ্বীনকে খন্ড-বিখন্ড
করেছে এবং তারা দলে দলে বিভক্ত হয়ে গেছে আপনি তাদের কোন
কিছুতেই অংশীদার নন” – সূরা আন’আম : ১৫৯ ।
হাসান বছরী (রহঃ) বলেন : তুমি বিদ’আতীর নিকট বসবে না , কারণ
সে তোমার হূদয়কে রোগাক্রান্ত করে দিবে ।
অতএব দ্বীন পরিপূর্ণরুপে ও সুস্পষ্টভাবে আসার পরেও যদি কোন
ব্যক্তি তাতে সন্তুষ্ট না হতে পেরে নতুন কিছুর অনুপ্রবেশ ঘটায় , তা
ইসলামের মধ্যে বিভক্তির কারণ এতে কোন সন্দেহ নেই । আর এ
বিভক্তিই পরস্পরের মাঝে দুশমনী সৃষ্টি করে । যার জলন্ত প্রমাণ
আমরা সমাজের মাঝে দিবালোকের ন্যায় প্রত্যক্ষ করছি । অতএব
বাস্তবতাও তার বিরাট একটি দলীল ।
৮. বিদ’আত মুহাম্মাদ (সাঃ) এর শাফা’আত প্রাপ্তি হতে বাধা
প্রদান করবে : কারণ হাদীসের মধ্যে বলা হয়েছে যে , বিদ’আতীকে
হাওযে কাওছারের পানি পান করা হতে বঞ্চিত করা হবে । তিনি
তাদের দূর হয়ে যেতে বলবেন । এটি প্রমাণ করছে যে তারা তাঁর
শাফা’আত হতেও বঞ্চিত হবে ।
এখানে শাতেবী (রহঃ) একটি দূর্বল হাদীস দিয়ে দলীল গ্রহণ করে ,
সেটির অর্থকে সহীহ আখ্যা দিয়েছেন । সেটি হচ্ছে ‘বিদ’আতী ছাড়া
আমার উম্মাতের সবাই আমার শাফা’আত পাবে’ (আল-ইতিসাম
১/১৫৯) ।
৯. বিদ’আত সহীহ সুন্নাহকে বিতাড়িত করে তার স্থলাভিষিক্ত হয় :
বাস্তব নমুনায় এর বিরাট প্রমাণ । সালাত শেষে জামা’বদ্ধ হয়ে হাত
তুলে দো’আ করলে , সালাতের পরে পঠিতব্য মুতাওয়াতির সূত্রের
সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত দো’আ ও যিকিরগুলো পড়া হয় না ।
এছাড়া ইসলামের বিভিন্ন ইবাদাতের মধ্যে দূর্বল হাদীস দ্বারা
প্রমাণিত এরুপ বহু আমল আমাদের সমাজে প্রচলিত আছে যা সরাসরি
সহীহ হাদীসর বিপরীত আমল । বিজ্ঞ পাঠকবৃন্দে নিকট এর চেয়ে আর
বেশী কিছু বলা প্রয়োজন মনে করছি না । অতএব দূর্বল বা জাল
হাদীসের উপর আমল করলে সহীহ সুন্নাহ বিতাড়িত হবেই । সালাফদের
ভাষ্য উল্লেখ করে পূর্বে (৫) এ বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে ।
১০. বিদ’আত সৃষ্টিকারী তার নিজের ও তার অনুসরণকারী
বিদ’আতের সাথে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তির সমপরিমাণ গুনাহের
অংশীদার হবে : রাসূল (সাঃ) বলেছেন : “যে ব্যক্তি ভ্রষ্টতার দিকে
আহবান করবে সে তার গুণাহ ও তার অনুসাররি গুণাগ বহন করবে ।
অনুসরণকারীদের গুণাহ সমূহে সামান্য পরিমাণ ঘাটতি না
করেই” (বুখারী ও মুসলিম)
কোন সন্দেহ নেই বিদ’আতের দিকে আহবান করা বা তার উপর আমল
করা পথভ্রষ্টতারই একটি অংশ । কারণ রাসূল (সাঃ) বলেছেন : ‘সব
বিদ’আতই ভ্রষ্টতা’ ।
১১. বিদ’আতীর অমঙ্গলজনক শেষ পরিণতির ভয় রয়েছে : কারণ
বিদ’আতী গুণাহের সাথে জড়িত , আল্লাহর অবাধ্য । আল্লাহ যা
হতে নিষেধ করেছেন সে তার সাথে জড়িত । তার সে অবস্থায় মৃত্যু
হলে অমঙ্গলজনক মৃত্যু হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে । এছাড়া কিয়ামত
দিবসে তাকে অমঙ্গলজনক পরিণতির সম্মুখীন হতে হবে । এর প্রমাণ
তিন নম্বরে বর্ণিত হাদীস , যা পড়লে সহজেই বঝা সম্ভব ।
১২. বিদ’আতীর উপর দুনিয়াতে বেইজ্জতী আর আখেরাতে আল্লাহর
ক্রোধ চাপিয়ে দেয়া হবে : (আখেরাতেও বেইজ্জতী হতে হেব তার
প্রমাণ তিন নম্বরে বর্ণিত হাদীস) । আল্লাহ তা’আলা বলেন :
“অবশ্যই যারা গাভীর বাচ্চাকে উপাস্য বানিয়ে নিয়েছে তাদের উপর
তাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে দুনিয়াতেই ক্রোধ ও লাঞ্ছনা এসে
পড়বে । মিথ্যারোপকারীদেরকে আমি অনুরুপ শাস্তি দিয়ে
থাকি” (সূরা আরাফ:১৫২) ।
সামেরীর প্ররোচনায় গাভীর বাচ্চা দ্বারা তারা পথভ্রষ্ট হয়েছিল
এমনকি তারা তার ইবাদাতও করেছিল । আল্লাহ তা’আলা আয়াতের
শেষে বলেছেন : “মিথ্যারোপকারীদেরকে আমি অনুরুপ শাস্তি দিয়ে
থাকি” । এটি ব্যাপকভিত্তিক কথা । এর সাথে বিদ’আতেরও সাদৃশ্যতা
আছে । কারণ সকল প্রকার বিদ’আতও আল্লাহর উপর মিথ্যারোপের
শামিল । যেমনটি আল্লাহ তা’আলা বলেছেন :
“নিশ্চয় তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে , যারা নিজ সন্তানদেরকে
নির্বুদ্ধিতাবশতঃ বিনা জ্ঞানে হত্যা করেছে এবং আল্লাহ
তাদেরকে যেসব রিযিক দিয়েছিলেন , সেগুলোকে আল্লাহর উপর
মিথ্যারোপ করে হারাম করে দিয়েছে । নিশ্চয় তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে
এবং সুপথগামী হয়নি” (সূরা আন’আম : ১৪০)।
অতএব আল্লাহর দ্বীনের মধ্যে যে ব্যক্তিই বিদ’আত সৃষ্টি করবে
তাকেই তার বিদ’আতের কারণে লজ্জিত ও লাঞ্ছিত হতে হবে ।
তাবেঈ’দের যুগে বাস্তবে বিদ’আতীদের ভাগ্যে এমনটিই ঘটেছিল ।
তাদেরকে তাদের বিদ’আত নিয়ে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে ।
১৩. সুন্নাতের বিরোধীতা করার কারণে বিদ’আতী নিজেকে ফিতনার
মধ্যে নিক্ষেপ করে : সুফিয়ান ইবনু ওয়াইনাহ বলেন : আমি ইমাম
মালেক (রহঃ) কে যে ব্যক্তি মদীনার মীকাতে পৌঁছার পূর্বেই ইহরাম
বাঁধলো তার সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলাম । তিনি উত্তরে বললেন : সে
আল্লাহ ও তার রাসূল (সাঃ) এর বিরুদ্ধাচারণকারী । তার উপর
দুনিয়াতে ফিতনার তার আখিরাতে পীড়াদায়ক শাস্তির আশঙ্কা
করছি । তুমি কি আল্লাহ তায়ালার বাণী শুননি ।
“যারা তাঁর নির্দেশের বিরোধীতা করবে তারা যেন সতর্ক হয়
তাদেরকে ফিতনা পেয়ে যাওয়া বা তাদেরকে পীড়াদায়ক শাস্তি
গ্রাস করা থেকে” (সূরা আন-নূর : ৬৩ ।
১৪. বিদ’আতের অন্যতম ভয়াবহতা কারণ এই যে , সহীহ সুন্নাহ , তার
ধারক – বাহক ও তার উপর আমলকারীকে বিদ’আতী ঘৃণা করবে এবং
তাকে মন্দ জানবে ।
১৫. বিদ’আতী নিজেকে শরী’আতের মধ্যে কিছু সংযোজনকরী
হিসাবে প্রকাশ করে : অথচ আল্লাহ তা’আলা তাঁর দ্বীনকে তাঁর
বান্দাদের জন্য পূর্ণ করে দিয়েছেন । “আজ আমি তোমাদের জন্য
তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম এবং তোমাদের উপর আমার
নেয়ামাতকে সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং তোমাদের জন্য ইসলামকে ধর্ম
হিসাবে পছন্দ করলাম ।” সূরা মায়েদা /৩
১৬. বিদ’আত হচ্ছে জ্ঞান ছাড়া আল্লাহর ব্যাপারে কথা বলা :
শরী’আতের মধ্যে নিজের পক্ষ থেকে কিছু বানিয়ে বললে তা যে কতই
ভয়ানক সেটি অনুধাবন করা যায় আল্লাহ কর্তৃক তাঁর নবী (সাঃ) কে
সম্বোধন করে বলা নিম্নোক্ত কঠোর ভাষার আয়াতগুলিতে :
“সে যদি আমার নামে কোন কিছু রচনা করতো , তাহলে আমি তার ডান
হাত ধরে ফেলতাম , অতঃপর তার গ্রীবা কেটে দিতাম তোমাদের
কেউ তাকে রক্ষা করতে পারতো না” (সূরা আল-হাক্কাহ : ৪৪-৪৭) ।
রাসূল (সাঃ) কেও নিজের পক্ষ হতে কিছু বনিয়ে বলার অনুমতি দেয়া
হয়নি , এ আয়াত তার জাজ্বল্য প্রমাণ । তেমন তিনি তাঁর নিজের
পক্ষ থেকে কিছু বলতেন না । আল্লাহ তা’আলা বলেন :
“আর তিনি নিজ ইচ্ছায় কিছু বলেন না , যতক্ষণ না তাঁর নিকট ওহী
নাযিল হয়” (সূরা আন-নাজম:৩-৫) ।
১৭. বিদ’আতীর জ্ঞান উলট-পালট হয়ে তার নিকট সব কিছুই
গোলমেলে হয়ে যায় । ফলে সে বিদ’আতকে সুন্নাত আর সুন্নাতকে
বিদ’আত মনে করে ।
অতএব বিদ’আতের ভয়াবহতা হতে রক্ষা পেতে হলে , আমাদের মাঝে
প্রচলিত বিদ’আতগুলো হতে সতর্ক হয়ে সেগুলোকে পরিত্যাগ করে
সহীহ সুন্নাহ মাফিক আমল করা ছাড়া আখেরাতে মুক্তির জন্য
আমাদের সামনে আর কোন বিকল্প পথ খোলা নেই । আসুন আমরা
দুর্বল ও বানোয়াট হাদীসগুলো জেনে সেগুলো পরিত্যাগ করি এবং
সহীহ হাদীসের উপর ভিত্তি করে আমাদের জীবন গড়ি ।
বিদ’আতের সাথে জড়িত হওয়ার কারণগুলো নিম্নরুপ :
১. কুরআন , সুন্নাহ ও আরবী ভাষা সম্পর্কে অজ্ঞতা ।
২. অতীতের সত্যানুসারী ব্যক্তিগণের মত ও পথের অনুসরণ না করা ।
৩. প্রবৃত্তি বা মনোবৃত্তির অনুসরণ করা ।
৪. সন্দেহমূলক বস্তুর সাথে জড়িত থাকা ।
৫. শুধুমাত্র স্বীয় বুদ্ধির উপর নির্ভর করা ।
৬. বড় বড় আলেমের উদ্ধৃতি দিয়ে তার অন্ধ অনুসরণ করা , যা
গোঁড়ামির দিকে নিয়ে যায় । আর তখনই সে কুরআন ও সুন্নাতের
দলীলগুলোকে অমান্য করে ।
৭. মন্দ লোকদের সংস্পর্শে থাকা ও চলা ।
পাঠক ভাই ও বোনেরা ! যে ব্যক্তি উপরোক্ত আলোচনা বুঝতে সক্ষম
হবেন , আমার মনে হয় সে ব্যক্তি নিজেকে বিদ’আত ও তার ভয়াবহত
হতে রক্ষার্থে এখন থেকে যাচাই – বাছাই করে পথ চলবেন । যাতে
করে অসতর্কতা বশতঃ বিদ’আতের মধ্যে জড়িয়ে না যান । যে আমলই
আমরা করি না কেন তা যাচাই – বাছাই করেই করা উচিত । কারণ হতে
পারে বহু আমল আমার , আপনার জীবনের সাথে জড়িয়ে আছে
যেগুলো দুর্বল বা বানোয়াট হাদীসের উপর নির্ভরশীল ।
রসূল (সাঃ) এর নিম্নোক্ত বাণী কোন ব্যক্তির ভুলে যাওয়া ঠিক হবে
না : “আমার এ নির্দেশের মাঝে যে ব্যক্তি এমন কিছু নবাবিস্কার
করবে যা তার অন্তর্ভুক্ত ছিল না , তা পরিত্যজ্য ।” (বুখারী
হা/২৬৯৭ ; মুসলিম হা/৩২৪২ ; আবু দাউদ হা/৩৯৯০ ; ইবনু মাজাহ
হা/১৪)
তিনি আরও বলেন : “যে ব্যক্তি এমন আমল করল যার উপর আমার
কোন নির্দেশ নেই সে আমলটি অগ্রহণযোগ্য ।” মুত্তাফাকুন আলাইহি
হা/৩২৪৩ ।
অতএব আমরা কার স্বার্থ রক্ষার্তে তথাকথিত হুজুরদের ধোঁকায় পড়ে
নবী (সাঃ) হতে সহীহ সনদে বর্ণিত হাদীসগুলো ছেড়ে দিয়ে
নিজেদেরকে বিপদগামী করব ?
আসুন ! আমরা রাসূল (সাঃ) এ শাফায়াত প্রাপ্তির প্রত্যাশায়
নিজেদেরকে তাঁর সহীহ সুন্নাহমুখী করি । আর অনুধাবন করি
নিম্নোক্ত হাদীসটি । কারণ একমাত্র তাঁর সহীহ সুন্নাহকে আঁকড়ে
ধরার বিষয়টি যে কত বড় গুরুত্বপূর্ণ এটি তারই প্রমাণ বহন করছে :
রাসূল (সাঃ) বলেছেন : “সেই সত্তার কসম যার হাতে আমার আত্মা
যদি মূসা (আঃ) জীবিত থাকতেন তাহলে আমার অনুসরণ করা ছাড়া
তার আর কোন সুযোগ ছিল না ।” মুসনাদ ইমাম আহমাদ হা/১৪৬২৩ ।
অতএব জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রের সার্বিক কল্যাণ একমাত্র রাসূল
(সাঃ) এর আদর্শের মধ্যেই আমাদেরকে খুঁজে নিতে হবে ।
আসুন ! আমরা জাল ও য’ঈফ হাদীসগুলো জানি এবং তথাকথিত
হুজুরদের জাল ও য’ঈফ হাদীস নির্ভর ফতোয়া ও আক্বীদাহ হতে
নিজেদেরকে মুক্ত করি । আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাঁর ও তাঁর নবীর
যথাযথ অনুসরণ করার তাওফীক দান করুন । আমীন ।

No comments

Powered by Blogger.